• সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৬
  • Uncategorized
  • 39
ঘুরে আসুন প্রকৃতির রাজপুত্র তাহিরপুর

ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক

জাফলংকে যদি বলা হয় প্রকৃতি কন্যা তাহলে তাহিরপুরকে বলতে হয় প্রকৃতির রাজপুত্র । সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলা প্রকৃতির নয়নাভিরাম চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের এক অপরুপ লীলাভূমি । খাগড়া ছড়ির সাজেক ভ্যালী, সিলেটের বিছানাকান্দি, জাফলং, নীলাজল, শিলংয়ের পাহাড় আর মেঘের খেলা সব যেন একটি ফ্রেমে বন্দি হয়েছে তাহিরপুরে ।

tahir-pur-4সুনামগঞ্জ শহরের প্রতিশ্রুতিশীল সম্ভাবনাময় কয়েকজন তরুনকে সাথে নিয়ে আমরা তাহরিপুরের প্রকৃতির টানে ছুটে গিয়েছিলাম ১৬ সেপ্টেম্বর বৃহষ্পতিবার । আমার সাথে ছিলেন হাফিজ ভাই, সোহেল ভাই, স্থানীয় সাংবাদিক স্নেহাষ্পদ আহমেদ ফারুক, নাহিদ, জাকের, রফিক মামা ও পাইলট ।
বৃহষ্পতিবার সকাল ১১ টায় সুনামগঞ্জের মোহাম্মদপুর পয়েন্ট হতে মোটর সাইকেল যোগে আব্দুজ জহুর সেতু পার হয়ে হাতের ডান দিকে বিশ্বম্ভরপুর সড়কে ছুটে চলেছে মোটর সাইকেলের চাকা । বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ বাজার, কারেন্টের বাজার হয়ে সোজা লাউড়ের গড় বাজারে গিয়ে হলো আমাদের যাত্রা বিরতি । সেখানে গ্রামীন পরিবেশে একটি রেষ্টেুরেন্টে পরোটা ও ডাল ভাজি দিয়ে আমাদের নাস্তা সেরে নেওয়া হলো ।

যাওয়ার পথে রাস্তার দু পাশে দিগন্ত বিস্মৃত সবুজের সমারোহ । যতই সামনে এগোচ্ছি ততোই যেন প্রকৃতি আমাদের আরও কাছে টানছে । লাউড়ের গড় বাজার পার হওয়ার পরই মূলত চোখে পড়ে প্রকৃতিক সৌন্দর্যের হাতছানি । ছোট্ট রাস্তার দু পাশে সারি সারি গাছ, পাশেই ঐতিহাসীক যাদুকাটা নদীর ভেসে উঠা বিস্তীর্ন এলাকা জুড়ে ধু ধু বালুচর । নদীর পাশে বেধে রাখা সারি সারি ছোট ছোট বারকি নৌকা ।

tahir-pur-5লাউড়ের গড় বাজার পার হয়েই রয়েছে শাহ আরেফিন মাজার । সেখানে মাজারকে কেন্দ্র করে রয়েছে বড় একটি বাজার । একেবারে ভারতের সীমান্ত ঘেষা এই এলাকায় যাওয়ার পর খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করা যায় পাহাড়ের চুড়ার ভাজে মেঘের নীলাচল খেলা । পাহাড় আর মেঘের খেলার ছলে ”এই রোদ এই ছায়া” এমন আবহ বেশ আনন্দময় ও বিমোহিত করে পর্যটকদের। সেখানে চলে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের ছবি তুলার ধুম । তবে সেখানে বিজিবির সতর্ক প্রহরা ছিলো চোখে পড়ার মতো ।

শাহ আরেফিন মাজার থেকে মোটর সাইকেল যোগে ফারুক, জাকের,রফিক মামা চলে যান লাউড়ের গড় যাদুকাটা নদী খেয়া ঘাটে । আর আমরা কয়েকজন শাহ আরেফিন বাজার থেকে যাদুকাটা নদীর ভেসে উঠা বালুচর দিয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার পায়ে হেঁটে পৌছি খেয়া ঘাটে । বালুচর দিয়ে হাঠতে গিয়ে মনে হচ্ছিল যেন কোন আরব দেশের মরুভূমি । একসময় যেন আর পা চলতে চায় না, প্রচন্ড পানির তৃষ্ণা পেয়ে বসে । তবে পথিমধ্যে কষ্ট ভূলিয়ে দিল নদীর পাশে গড়ে উঠা কাশফুলের স্পর্শ । কাশফুলের নরম ছোয়ায় ক্যামেরার ক্লিক করতেও ভূললেননা হাফিজ ভাই । সেখানে অসংখ্য মানুষের বালু থেকে পাথর বাছাই কওে পাথর বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের দৃশ্যও আমাদের চোখ এড়ালোনা । এমনকি ছোট ছোট শিশুরাও পাথর উত্তোলনের কাজে ব্যাস্ত ।

tahirpur-2আবার দিগন্ত বিস্তৃত এলাকা জুড়ে বালির ঢেউ, পাশেই যাদুকাটার যাদুময় নীল পানির শান্ত স্রোত, অদূরেই মেঘালয়ের পাহাড়ের চুড়া থেকে নেমে আসা ঝর্নার মনোরম দৃশ্য আর পাহাড়ের ভাজে ভাজে বহুতল বিল্ডংয়ের দৃশ্য গুলো বার বার পিছনে টানে আমাদের ।
অবশেষে প্রায় দেড় কিলোমিটার বালুচরে হেটে আমরা এসে পৌছি যাদুকাটা খেয়াঘাটে । সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষমান সঙ্গীরা ।

ক্লান্ত পরিশ্রান্ত আমরা হাত পা ধুয়ে সতেজ হতে নদীর পানি স্পর্শ করতেই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম । যাদুকাটার যাদুময় নীলাজল আর পানির শীতল স্পর্শের লোভ সামলাতে না পেরে আমরা সবাই একে একে ঝাপ দিলাম নদীতে । সবাই প্রায় এক ঘন্টার সাতার কেটে গোসল করলাম সেখানে । ঘুরতে আসা অসংখ্য পর্যটকদের দেখলাম কেউই গা ভিজাতে ভূল করেন না । তবে সেটা অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয় কেবলই পরিচ্ছন্ন আর ঠান্ডা পানির স্পর্শ পেতে। পানির শীতলতা,নিরবতা,কিছু মুহুর্ত এনে দেয় যা নিশ্চল ছবির ফ্রেমের মত ।

tahirpur-1সেখান থেকে আমরা ভেজা কাপড়েই খেয়া নৌকা যোগে মোটর সাইকেল সহ যাদুকাটা নদী পার হই। নদী পার হওয়ার পর কেউ মোটর সাইকেল নিয়ে আবার কেউ পায়ে হেটে উঠতে হয় অনেক উচু পাহাড়ে । পাহাড়ের নাম ”বারিকা টিলা” । উপরে উঠার রাস্তা পাকা থাকায় কোন অসুবিধা হয়না। উঠার পর সেখানে গিয়ে আপনার মনে হবে এ যেন খাগড়াছড়ির ”সাজেক ভ্যালীতে” চলে এসেছেন । সেখান থেকে যাদু কাটা নদী, পানি আর বালুর মিলনমেলা, মেঘালয়ের পাহাড় ও মেঘের খেলা খুব কাছ থেকে উপভোগ করা যায় ।

সেখান থেকে আবার টিলার অনেক নিচে নামতে হবে । রাস্তার দু পাশে লেবু বাগান, সুপারী বাগান সহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের বাগান সব মিলিয়ে আপনি যেন প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাবেন । ইতিমধ্যে বারিকা টিলায় রিসোর্ট নির্মান করার জন্য সরকার ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে । ফলে খুব শীঘ্রই এই এলাকা পর্যটকদের জন্য উপযোগি হয়ে উঠবে ।

সেখান থেকে সোজা আমরা চলে যাই বাদাঘাট বাজারে । বিশাল বড় বাজার । অনেক উপজেলা শহর থেকেও বড় । ইদানিংকালে এই বাজারে উন্নত মানের আবাসিক হোটেল ও রেস্টুরেন্ট হয়েছে । পর্যটকদের এখন থাকা ও খাওয়ার কোন অসুবিধা হবেনা । বাদাঘাট বাজার থেকে সাংবাদিক আহমদ ফারুকের নিকটাত্মীয়ের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া সেরে নিলাম আমরা । তখন লালিমা সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে । নেমে আসছে অন্ধকার। সময় স্বল্পতার কারনে যাওয়া হলোনা ট্যাকেরঘাট কয়লা খনি, বড় ছড়া ও লামড়া ছড়া । যা দেখতে সিলেটের বিছানাকান্দির মতোই । যেখানে আরও সুন্দর দৃশ্য পর্যটকদের জন্য অপেক্ষমান ।

বাদাঘাট পৈলানপুর গ্রামে সাংবাদিক ফারুকের তালতো ভাই হারুন, জুবায়ের , সোয়াইব ও ভাবি সহ স্বজনদের আথিতেয়তা আমাদের বেশ মুগ্ধ করলো । এবার ফেরার পালা । ইতিমধ্যে রাত নেমে এসেছে । বাদাঘার বাজারে গ্রামীন ব্যাংক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সাগর,আসাদুল হক রনি ও রুবেল ভাইয়ের সমাদর আথিতেয়তা অমায়িক ব্যাবহার ও কফি আড্ডা আমাদের ভ্রমনে নতুন এক মাত্রা যোগ করল । পরবর্তীতে সাগর ও রুবেল ভাই মোটর সাইকেল নিয়ে আমাদের যাদুকাটা নদীর মিয়ারচর খেয়া ঘাট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ করলেন । কেয়াঘাটে দেখা হল সিলেট ও বিয়ানীবাজার থেকে সেখানে ঘুরতে যাওয়া আরু কিছু তরুনের সাথে ।

নদী পার হয়ে রাতের নিস্তব্ধতায় আমাদের মোটর সাইকেল এর চাকা ঘুরতে থাকে সুনামগঞ্জ শহরের উদ্দেশ্যে । বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা সদরের বুক দিয়ে, পলাশ বাজার হয়ে আমরা এসে পৌছি সুনামগঞ্জ শহরের প্রবেশমুখ আব্দুজ জহুর সেতুতে । সেখানে কিছু সময় হয়ে গেলো জোছনা রাতের আড্ডা ”জোছনা বিলাস” । রাতের কাটা তখন ১০ টা ছুই ছুই । অবশেষে সুনামগঞ্জ শহরের মোহাম্মদপুর পয়েন্টে পৌছি আমরা । সেখানে আমাদের স্বাগত জানালেন বড় ভাই আব্দুস সাত্তর মামুন ও এডভোকেট আইন উদ্দিন ভাই । প্রকুতির কাছে ছুটে চলুন আপনিও । উপভোগ করুন মেঘ,পাহাড়,পানি বালুর এক অপরুপ খেলা ।

Enam

লেখকঃ ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক
সাংবাদিক, কলামিষ্ট