• জুলাই ৭, ২০১৮
  • জাতীয়
  • 67
বেঁচে থাকার লড়াই তানজিমের, ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে আছেন মা

টাইমস্ বিডি ডেস্ক : ‘মেয়েটাকে নিয়ে মনে বড় আশা ছিল আমার। সে কম্পিউটার শিখতে চাইছিল। আমিও না করি নাই। ভাবছিলাম, লেখাপড়া শিইখ্যা সে চাকরি করবে। পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে। কিন্তু সেই মেয়ে আমার এখন আইসিইউতে পইড়্যা আছে। এক সন্ত্রাসী এসিড ঢাইল্যা তার শরীরটা জ্বালায় দিছে।’ কষ্ট আর হাহাকার নিয়ে কথাগুলো বলেন ভোলায় এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ঢাকার সিটি হাসপাতালের আইসিইউয়ে জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে থাকা কিশোরী তানজিম আক্তার মালা’র মা জান্নাতুল ফেরদৌস। সব হারানোর বেদনা নিয়ে ফ্যাল ফ্যালে চোখে তাকিয়ে আছেন তিনি। কথা বলতে বলতেই ডুকরে কেঁদে উঠছেন। প্রাণবন্ত একটা মেয়ে যদি জীবন্ত দগ্ধ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরায়, মায়ের প্রাণে সে আঘাত কেমন বিঁধে তাই যেন বলে দিচ্ছে তার মুখচোখ।

১৫ মে ২০১৮। নিজ ঘরে ছোট বোনের সঙ্গে ঘুমিয়ে ছিল সদ্য এসএসসি পাশ কিশোরী তানজিম আক্তার মালা (১৬)। ভোলা সদর উপজেলার উত্তর দিঘলদী ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রাম রাত বাড়লে নীরব, সুনসান। সেই রাতের নিস্তব্ধতা হঠাৎ ভেঙে যায় তানজিম আক্তার মালা ও তার বোন দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু মারজিয়ার (৮) আর্ত চিৎকারে। বাবা হেলাল রাড়ি, মা জান্নাতুলসহ আশেপাশের মানুষ ছুটে এসে দেখতে পান কাটা মুরগির মতো ছটফট করছে তানজিম ও মারজিয়া। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে বুঝতেই পারেননি কী হয়েছে ওদের। কিন্তু, ‘জ্বলে যাচ্ছে’ আর ‘কে দিলো’, ‘কে মারলো’ বলে চিৎকার করছিল যখন তানজিম–তখন তারা বুঝতে পারেন তাদের দুই মেয়ে এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে।

মারজিয়া এখন খানিকটা সুস্থের দিকে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মারজিয়ার কাঁধ ও গলা এসিডে ঝলসে গেলেও এখন সে ঝুঁকিমুক্ত। হয়তো সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে। কিন্তু, তানজিম আক্তার মালাকে নিয়ে চরম আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা। তার দুই চোখ এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। শরীর পুড়ে গেছে ২৪ শতাংশ। এরইমধ্যে তার শরীরে পানি চলে এসেছে। তার অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।

তারা এখন রাজধানীর এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ভর্তি। মেয়েদের ধরতে গিয়ে এসিডে পুড়ে গেছে মায়ের হাতও। ছোট মেয়ে মারজিয়া আর তিনি এখানেই চিকিৎসাধীন। আর মুমূর্ষু অবস্থায় তানজিম আক্তারকে এখন লালমাটিয়ার সিটি হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়েছে।

জিজ্ঞাসা করলে থেমে থেমে সে ভয়াবহ রাতের কথা বলেন মালার মা জান্নাতুল ফেরদৌস, ‘আমার মেয়ের গায়ে যখন এসিড লাগছে তখন সে কে দিলো কে দিলো বলে চিৎকার মারছে। আমি আজ পর্যন্ত এসব (এসিড ছুড়ে মারার ঘটনা) দেখিই নাই। এমন করে মেয়ের যে বিপদ হয় জানিই না। আমরা পুকুরে নিয়া মেয়েরে বসাই রাখছি। মেয়ের গায়ের কাপড় পুড়ে গেছে।’

কারও গায়ে এসিড লাগলে তার ক্ষত স্থান বারে বারে বেশি বেশি পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে হয়। তানজিমের ক্ষেত্রেও তা হলে হয়তো তার শরীর এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতো না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের মেডিক্যাল অফিসার সামসুন নাহার সুলতানা  বলেন, ‘ভোলাতে এসিড আক্রান্ত হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা হয়নি। আক্রান্ত হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে সেভাবে পানি ঢালা হয়নি। তাদের ভোলা হেলথ কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে তাদের গায়ে পানি ঢালা হয়।’

এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘আমাদের এখানে ১৬ মে ভর্তি হয় তানজিম। তার বার্নের পরিমাণ ২৪ ভাগ। শুরু থেকেই ও খুব বেশি আক্রান্ত ছিল। এর মাঝে ওর দুই বার অস্ত্রোপচার হয়েছে। ক্ষত স্থানে চামড়া লাগানো হয়েছে। গত ২৯ জুন ওর অবস্থা বেশি খারাপ হয়ে যায়। ওর হঠাৎ করে প্রচুর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ওকে তখন আমরা মেট্রোপলিটন হাসপাতালের আইসিইউতে শিফট করি। জুলাইয়ের ১ তারিখে তাকে লালমাটিয়ার সিটি হাসপাতালের আইসিইউতে শিফট করা হয়। এখন সে সেখানে আছে। তার অবস্থা খুবই শোচনীয়।’

তানজিমার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন এই চিকিৎসক জানান, ‘তার অবস্থা ধীরে ধীরে অবনতির দিকে যাচ্ছে। ওর ক্রিটেনিন লেভেল বেড়ে যাচ্ছে। তারা ইউরিন আউটপুটও কমে যাচ্ছে। সে এখন ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে আছে। ওর পুরো মুখ, দুই চোখ, গলা, বুক, ডান কান, ডান হাত, ডান পা সবটাই পুড়ে গেছে। বাম হাত ও বাম পায়ের বেশ খানিকটা অংশও পুড়ে গেছে। ‌তার দুই চোখ নষ্ট হয়ে গেছে ।’

চিকিৎসক সামসুন নাহার তানজিমের বোন মারজিয়া সম্পর্কে বলেন, ‘ওর কাঁধে ও গলায় বার্ন আছে। ও এখন ঝুঁকিমুক্ত। ওর মেয়েকে ধরতে গিয়ে মায়ের বাম হাত পুড়ে গেছে। তিনিও এখন আন্ডার ট্রিটমেন্টে আছেন। তবে, তিনিও ঝুঁকিমুক্ত।’

বড় বোন তানজিমের সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে এসিড দগ্ধ হয় শিশু মারজিয়াও। ছবি ঘটনার পরদিন ভোলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের।

যে মেয়ে এসএসসি পাস করে এইচএসসিতে ভর্তির প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত ছিল হঠাৎ করে সে এমন পরিস্থিতির শিকার হলো কেন জানতে চাইলে ক্রোধে বিস্ফারিত চোখে তানজিমের মা বলেন, ‘ অপুরে যদি পাইতাম, আমি অরে নিজ হাতে শিক্ষা দিতাম। আমাদের তিন মা-ছায়ের জীবন হে শেষ কইর‌্যা দিছে।’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

এই এসিড সন্ত্রাসের হোতা হিসেবে অভিযুক্ত মহব্বত হাওলাদার অপুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনার পরদিন ১৬ মে গ্রেফতারের পর এক সংবাদ সম্মেলনে ভোলার পুলিশ সুপার মো. মোকতার হোসেন জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অপু পুলিশের কাছে এসিড নিক্ষেপের কথা স্বীকার করেছে। পরে আদালতেও এ কথা স্বীকার করে সে।

অপুর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী প্রেমঘটিত বিবাদের কারণে তানজিমের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ‘শিক্ষা দেওয়ার’ জন্য এ ঘটনা ঘটায়। এসময় সে তানজিম আক্তার মালার বিরুদ্ধে একাধিক জনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িত থাকার অভিযোগ করে। তবে মুমূর্ষু অবস্থায় তানজিম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সে জানিয়েছে, অন্য বন্ধু এবং নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ককে অন্য কিছু ভেবে এই ঘটনা ঘটিয়েছে অপু।

এ ব্যাপারে তানজিমের মা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘ওই পোলার (অপু) লগে আমার মেয়ের দুই মাসের সম্পর্ক ছিল এটা মেয়ে স্বীকার করছে। শুনছি তখন ওই পোলা মেয়েরে ফোন দিত। কিন্তু, সে এমন কাজ করবে স্বপ্নেও ভাবি নাই ।’

অপু তার স্বীকারোক্তিতে তানজিমকে বিভিন্ন সময়ে টাকা দেওয়ার যে দাবি করেছে তাও সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে পাল্টা দাবি করেছেন তানজিমের মা। তিনি বলেছেন,‘ সে (অপু) এখন মিথ্যা কথা বলে। বলে যে, আমার মাইয়া বিশ হাজার, ত্রিশ হাজার টাকা ধার নিছে। আমার মাইয়া ওর থন কোনও টাকা লয় নাই। একদিন আমার মাইয়া হের লগে দেখা করবার গেছিল, তখন হে ২০০ টাকা সিএনজি ভাড়া দিছে। আমার মেয়ের সম্বন্ধে আমি জানি। আমার মেয়ের সব খরচ আমি দিছি।’

তিনি বলেন, ‘ও (অপু) আমার মেয়ের জীবনটা নষ্ট করেছে। আমি আমার মাইয়ার তিনটা থ্রিপিস নিয়া আনছি। আমার ঝি থ্রিপিস পরতে পারে না। একটাও পরাইতে পারি না । আমার মনে অনেক আশা ছিল। আমার মেয়েরে নিয়ে অনেক আনন্দ করুম। এই পোলা আমার সব কিছু শেষ কইর‌্যা দিলো।’

মেয়ের কথা বলতে বলতেই হাসপাতালের বিছানায় হু হু করে কেঁদে ওঠেন জান্নাতুল। চোখ মুছতে মুছতেই হঠাৎ যেন উদাস হয়ে যান। ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন হাসপাতালের দেয়ালের দিকে, যেন দেয়াল ফুঁড়ে এখনই কেউ এসে তাকে দেবেন কোনও সুসংবাদ, মেয়ের সুস্থতার খবর। প্রহর কেটে যায়। কেউ আসে না।

হঠাৎ তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মেয়ের গায়ে এসিড নিক্ষেপের অপরাধে অপুর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন, ‘অপুর সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। ওর ফাঁসি চাই। যদি ভোলাতে ওর ফাঁসি হয়, তাইলে এসিড নিক্ষেপ অনেক কমে যাবে।’

চিকিৎসকও বলেন, ওর এ অবস্থার পিছনে যে দায়ী, তার সর্বোচ্চ শাস্তি না হলে এই ধরনের ঘটনা বাড়তেই থাকবে।

এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সেলিনা আহমেদ  বলেন, আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের তিনজনকে সবসময় চিকিৎসা সহায়তা দিচ্ছি। তানজিম সারভাইভ করবে কিনা এটা নিয়ে আমরা শঙ্কিত! আমরা চাই এসিড যে ছুঁড়েছে তার সর্বোচ্চ শাস্তি হোক। তাকে যেন জামিন না দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, এমন ভয়াবহ ঘটনার পরেও ভোলায় এসিড নিক্ষেপ থামেনি। গত ১ জুলাই গভীর রাতে দাদির সঙ্গে ঘুমন্ত অবস্থায় একইভাবে এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে চরফ্যাশন উপজেলার শশীভূষণ থানার রসুলপুর ইউনিয়নের শশীভূষণ গ্রামের আয়েশা বেগম (১৪) নামে আরেক কিশোরী। দুর্বৃত্তরা এসিড নিক্ষেপ করে তারও মুখমণ্ডলসহ শরীর ঝলসে দিয়েছে।