• নভেম্বর ১২, ২০১৮
  • মতামত
  • 26
শুভকামনা নড়াইলের ম্যাশ!

তুষার আবদুল্লাহ: উৎসব মঞ্চের পেছনের সবুজ কক্ষে থাকে ক্রন্দন, বেদনা। খুব কমই সেই কান্নার শব্দ দর্শক সারিতে এসে পৌঁছে। বাংলাদেশ প্রবেশ করছে ভোটের মহা উৎসবে। ঢাক-বাদ্য বেজে উঠেছে। উৎসবকে ঘিরে থাকা কুয়াশা, মেঘ কেটে রোদ উঁকি দিয়েছে। বেশ ঝলমলে রোদ। কার্তিক পেরিয়ে নবান্নের পথে বাংলাদেশ। এবার শুধু ফসলের নয়, ভোট উৎসবের ঘ্রাণে মাতোয়ারা হবে এই জনপদ। কিন্তু তারপরও দেখলাম হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগিয়ে তুলছি আমরা। অতি সুখ সইতে পারছি না। তাই বেদনা বিলাস।

আপাতত সেই বেদনার উপলক্ষ মাশরাফি বিন মর্তুজা। তিনি কেন আওয়ামী লীগের পক্ষে মনোনয়নপত্র তুললেন? জাতি হতাশ। সবাই অবাক হয়ে গেলেন। আশ্চর্য, কেন আমরা হতাশ হবো, অবাক হবো? মাশরাফি নড়াইল থেকে মনোনয়ন নিয়ে অপরিচিত, নতুন কোন পথে কি হাঁটলেন? একেবারেই নয়। বরং তিনি হাঁটতে শুরু করলেন চেনা পথে।

বাংলাদেশ মাশরাফিকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক বলে ভেবেছিল। ২২ গজের বীরকে ঘিরে তৈরি করেছিল ঐক্যের মিনার। মাশরাফি নিজেই কিন্তু সেই স্বীকৃতি এবং আবেগকে বিনয়ের সঙ্গেই অস্বীকার করেছিলেন। ক্রিকেট উন্মাদনাই শেষ কথা নয়। তার বাইরেও আছেন অনেক বীর। দেশ স্বাধীন করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। তারপর সবাই মিলে দেশ গড়ে তোলার লড়াই করছেন। এমন কথা মাশরাফি গণমাধ্যমের সঙ্গে একাধিকবার বলেছেন। তার আবেগে অন্ধ হয়েছেন আমাদের ক্রিকেটপ্রেমীরাও। মাশরাফিকে উৎসর্গ করেন অনিকেত প্রান্তর।

মাশরাফি মনোনয়নপত্র নেওয়ায় যারা হতাশ হয়েছেন, তাদের দুটি পক্ষ। একপক্ষ বলছেন, তিনি কেন কোনও রাজনৈতিক একটি দলের হবেন। অন্যপক্ষ বলছেন, অবসরে না গিয়ে কেন রাজনীতিতে নাম লেখালেন? দ্বিতীয় উত্তরটি আগে দিয়ে নিই– সনাত জয়সুরিয়া টেস্ট থেকে সরে গিয়ে একদিনের সীমিত ওভার এবং টি-টোয়েন্টি খেলা অবস্থাতেই রাজনীতির ক্রিজে নেমেছিলেন। দায়িত্ব নিয়েছিলেন উপ-মন্ত্রীর। সেদিক থেকে মাশরাফি তার ২২ গজের পূর্বসূরীকে অনুসরন করলেন। ব্যতিক্রম কিছু হয়নি।

প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলি, আমরা যারা পেশাজীবী তারা কে কোন দলের হওয়া বাকি রেখেছি? চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, পুলিশ, সাংবাদিক, লেখক, অভিনয়-সংগীতশিল্পী, আমরা কি পেরেছি নিজেদের রাজনৈতিক ব্যানারের বাইরে রাখতে? বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সর্বকালের প্রিয় কোনও অভিনেত্রী বা অভিনেতা যখন কোনও দলীয় মনোনয়ন নিয়েছিলেন, তখন আমরা কি এই প্রশ্ন তুলেছিলাম রুপালি পর্দার হৃদয় ঝড় তোলা ওই মানুষটি কেন একটি দলের হবেন? যদ্দুর মনে পড়ে এই প্রশ্নটি আসেনি। তার বা তাদের জনপ্রিয়তা সেই সময়ে মাশরাফির চেয়ে কম ছিল বলে মনে করি না। তফাৎ তারা বিশ্ব তারকা হতে পারেননি। মাশরাফি বিশ্ব তারকা।

এবারও আওয়ামী লীগ-বিএনপি থেকে অভিনয় ও সংগীতের আরও তারকা মনোনয়নপত্র তুলেছেন, তাদের নিয়ে এমন প্রশ্ন আসেনি। কারণ, তারা আগেই তাদের বিভক্তির পরিচয় রেখে আসছিলেন। রাজনৈতিক অবস্থান তাদের আগে থেকেই স্পষ্ট।

মাশরাফি আবেগ ও ভালোবাসার ঐক্যের মিনার হিসেবে গড়ে উঠেছেন, এটা আরোপিত নয়। তিনি বাংলাদেশ দলকে নিয়ে যেভাবে লড়াই করেছেন, ছিনিয়ে এনেছেন সাফল্য। বিশেষ করে শারীরিক আঘাত উপেক্ষা করে দল ও দেশের জন্য তার নিবেদনই তাকে ভক্তদের এই আসনে উঠিয়ে নিয়ে এসেছে। তাই তার একটি দলের পক্ষে মনোনয়ন নেওয়াকে ঐক্যের আবেগ থেকে চ্যুত হওয়া ভাবছি আমরা। যদি রাজনৈতিক কোনও আদর্শ বা দলের আনুগত্য দেখানোকে আমরা তার চিন্তার সংকীর্ণতা বলে দেখি আমরা, তাহলে বলতে হবে এই সংকীর্ণতা ব্যক্তি বা ক্রিকেটার মাশরাফির নয়।

এটা আমাদের জাতিগত দরিদ্রতা। আমাদের কতজন শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, লেখক বা অন্য পেশাজীবী নিজেদের জাতীয় ঐক্যের প্রতিকৃতিরূপে টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন? পারতেন, এমন অসংখ্য মানুষ আমাদের ছিলেন। যারা সরাসরি রাজনীতির খাতায় নাম না লিখিয়েও সকল দল-মতের হয়ে থাকতে পারতেন। কিন্তু সমস্যা একটাই- সকলে টি-টোয়েন্টি ম্যাচের খেলোয়াড় হতে গিয়ে ঐক্যের প্রতিকৃতি হওয়ার ক্রিজে টিকতে পারেননি।

রাজনীতিতে গিয়ে তারা দেশ ও মানুষের জন্য কতটা নিবেদিত হতে পেরেছেন, সেই আমলনামা জনগণের হাতে। জানি না সেই ভয় থেকেই হয়তো এই মুহূর্তের ভরসা মাশরাফিকে হারাতে চাননি তার সম্মিলিত মতের ভক্তরা। তারপরও ভরসা রাখি। ক্রিকেট মাঠের মতোই, রাজনীতির পিচে তিনি ব্যতিক্রমী হয়ে উঠুন। শুভ কামনা, ম্যাশ!

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি