• মার্চ ৭, ২০১৯
  • জাতীয়
  • 26
সুলতান মনসুরের শপথ আটকানোর সুযোগ নেই

নিউজ ডেস্ক: গণফোরাম থেকে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদের শপথ আটকানোর কোনও সুযোগ নেই। মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে বিজয়ী সুলতান মনসুরের শপথ গ্রহণের বিষয়টি তার নিজের ইচ্ছাধীন। তিনি চাইলে শপথ নিতে পারবেন। সিলেট-২ আসন থেকে ‘উদীয়মান সূর্য’ প্রতীকে নির্বাচিত গণফোরামের মোদাব্বির খানও চাইলে শপথ নিতে পারবেন। এ দুজনের দল গণফোরাম বা জোট ঐক্যফ্রন্ট চাইলেও আইনত তাদের শপথ আটকাতে পারবে না। তবে দল থেকে বহিষ্কার করে সেই সিদ্ধান্ত স্পিকারের কাছে জানিয়ে দিলে সেক্ষেত্রে তাদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হতে পারে। সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ করে এমন তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গণফোরামের মনোনীত সুলতান মনসুর ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট করলেও তার হিসাব-নিকাশে কোথাও বিএনপির প্রসঙ্গ আসার সুযোগ নেই। তারা জানিয়েছেন, বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে অনাপত্তিপত্র দিয়ে গণফোরামের ওই প্রার্থীকে নির্বাচনের প্রতীক হিসেবে ‘ধানের শীষ’ ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। অন্য দলের প্রতীকে ভোট করলেও কোন ব্যক্তি যে দলের থেকে মনোনয়ন পান সেই দলের প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন। নির্বাচনে জয়ী হলে গেজেটেও মনোনীত দলের প্রার্থী হিসেবে তাকে প্রকাশ করা হবে। শপথ নেওয়ার পরও তিনি ওই দলের সংসদ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। এক্ষেত্রে কোন দলের প্রতীকে ভোট করেছেন, সেটা বিবেচনায় আসবে না। ফলে সুলতান মনসুরের ক্ষেত্রে যেকোনও ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে কেবল তার দল গণফোরামের। এক্ষেত্রে ‘ধানের শীষে’ ভোট করলেও এই প্রতীকের স্বত্বাধিকারী বিএনপির কিছুই করণীয় নেই এখানে।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের যুগ্মসচিব ফরহাদ আহম্মদ খান বলেন, ‘কোন প্রতীকে নির্বাচন করেছেন, সেটা বিবেচনায় নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। কোন দলের মনোনয়ন পেয়েছেন, সেটাই একমাত্র বিবেচিত বিষয়। অন্য দলের প্রতীক ব্যবহারের বিষয়টি জোটভুক্ত দলের জন্য একটি সুযোগ, যেটা সংশ্লিষ্ট দলের অনুমোদন সাপেক্ষে কমিশন দিয়ে থাকে। আর এর কার্যকারিতা নির্বাচন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।’

এদিকে গণফোরামের মনোনয়নে বিজয়ী অন্য প্রার্থী মোদাব্বির খান গণফোরামের দলীয় প্রতীক ‘উদীয়মান সূর্য’ নিয়েই নির্বাচন করেছেন। ফলে তার ক্ষেত্রে বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টের ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতার সুযোগও নেই।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নিজেদের গণফোরাম না চাইলেও ব্যক্তিগতভাবে চাইলে দুই সংসদ সদস্য শপথ নিতে পারবেন। এক্ষেত্রে দল শপথ গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনও প্রতিবদ্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। এ বিষয়ে সংসদ সচিবালয়ের উপসচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কারো নামে গেজেট হয়েছে তো তার শপথ পড়ানোর দায়িত্ব স্পিকার মহোদয়ের। ওই ব্যক্তি যখন চাইবেন তখনই তার শপথ হবে। আর ৭০ অনুচ্ছেদের দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার যে বিধানের কথা বলা হয়েছে, সেটা তো সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রে। শপথ নেওয়ার পরেই কেবল এই বিধান কার্যকর হবে। কারণ, পথ নেওয়ার আগে কেউ সংসদ সদস্য হন না।’

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কারো শপথ আটকানো না গেলে দল যদি চায় শপথের পরে অর্থাৎ সংসদ সদস্য হওয়ার পরে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন। তাদের দল থেকে বহিষ্কার করে স্পিকারের কাছে তা জানিয়ে দিলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে তাদের সংসদ সদস্য বাতিল হবে।
সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও মোকাব্বির খানসংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাজনৈতিক দল থেকে পদত্যাগ করলে বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া কথা বলা আছে।

এতে বলা হয়েছে, ‘কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে। তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’

এই বিধান অনুসারে পদত্যাগ ও বিপক্ষে ভোট দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে পদশূন্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এখানে দল থেকে বহিষ্কারের কথা কিছু স্পষ্ট করে বলা হয়নি। অবশ্য সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বিপক্ষে ভোট দেওয়ার বিষয়টি বহিষ্কার হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা বলেন।

প্রসঙ্গত, কোনও দল তার সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করলে দলের পক্ষ থেকে সংসদের স্পিকারকে চিঠি লিখতে হবে। সংশ্লিষ্ট সদস্য ৭০ অনুচ্ছেদ ভঙ্গ করেছেন উল্লেখ করে তার সদস্য পদ শূন্য করতে অনুরোধ করবেন। এক্ষেত্রে স্পিকার প্রাথমিকভাবে যদি মনে করেন ৭০ অনুচ্ছেদ ভঙ্গ হয়েছে তখন তিনি বিষয়টি শুনানির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাবেন। কিন্তু কমিশনের শুনানিতে সন্তুষ্ট না হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি উচ্চ আদালতে যেতে পারেন।

এর আগে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিষ্কার করে তার সদস্য পদ শূন্য করতে স্পিকারের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। স্পিকার ওই চিঠি নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়ে দেন। তবে, নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগেই লতিফ সিদ্দিকী নিজেই সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তার ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে ৬৭ (২) অনুচ্ছেদ (পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার সাপেক্ষে) কার্যকর হয়েছিল।

জানতে চাইলে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘শপথের প্রশ্ন আসছে কেন, এটা আমরা বুঝতে পারছি না। আমাদের সিদ্ধান্ত তো এখনও শপথ না নেওয়ার পক্ষে বহাল রয়েছে।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মোদাব্বির খান তো আমাদের জানিয়েছেন, তিনি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেন না। আর অন্যজন তো বলছেন, গণফোরামও করেন না, বিএনপিও করেন না। দেখি উনি কী করেন? তখন আমাদের যে সিদ্ধান্তের প্রশ্নে আসে, সেটা দেখবো।’

ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে ওই দুই নির্বাচিত ব্যক্তির শপথ আটকানোর কোনও সুযোগ নেই। কারণ, আমরা যে ৭০ ধারার বিধানের কথা বলছি, সেটা কার্যকর হবে কোনও সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রে। উনারা তো শপথ নেওয়ার আগে সংসদ সদস্য হচ্ছেন না। তবে, আমি মনে করি আইনে আটকানো না গেলেও নৈতিকতার প্রশ্নে উনারা শপথ নিতে পারেন না। যে ব্যক্তিকে নিয়ে এই প্রশ্ন উঠেছে, সেই সুলতান মোহাস্মদ মনসুর আহমেদ রাজনীতি করেছেন আওয়ামী লীগের, মনোনয়ন নিয়েছেন গণফোরামের আর প্রতীক নিয়েছেন বিএনপির। এখন সেই গণফোরাম আর বিএনপির সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ নেবেন, এটা কতটা নৈতিক হবে?’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘এ ধরনের বিষয় আমাদের এখানে আগে কখনও দেখা যায়নি। ফলে এটি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে। বহিষ্কার না করার আগ পর্যন্ত তাদের শপথ নিতে আইনগত কোনও বাধা নেই। তবে, শপথের আগে যদি বহিষ্কার করা হয় তাহলে শপথ সিদ্ধ হবে বলে আমি মনে করি না। আর শপথ যদি নেনও পরে বহিষ্কার করে সংসদকে জানিয়ে দিলে তার সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে।’

নির্বাচন কমিশনের সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করেছেন। আমাদের কিছু করার নাই। গেজেট প্রকাশ করা পর্যন্ত কমিশনের কাজ। এরপর এটা সংসদ দেখবে। আমাদের আর কিছু করার নাই। এরপর কী হবে, আসন শূন্য হলো কি হলো না, তাতে আমাদের কাজ নেই।’

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন বিজয়ী হিসেবে যাদের গেজেট করেছেন তারা শপথ নিতে চাইলে আমার পড়ানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এটা আমার সাংবিধানিক দায়িত্ব। তবে, কোনও দলের অভ্যন্তরীণ কোনও বিষয় থাকলে কী হবে, সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। এ বিষয়ে আমার কোনও মন্তব্য নেই।’