• মার্চ ১৪, ২০১৯
  • রাজনীতি
  • 44
নতুন দল গঠন করলেও আদর্শ বদলাবে না জামায়াত

নিউজ ডেস্ক: ৭৯ বছরে পা দেয়া জামায়াতে ইসলামীর বাংলাদেশ শাখার সামনে ঝুলছে নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি। দলের যুদ্ধাপরাধের দায়ে সিনিয়র নেতাদের ফাঁসি, রাজনৈতিক মামলা ও ক্ষমতা থেকে দূরে থাকা জামায়াতে ইসলামী ঘুরে দাঁড়াতে নতুন নামে আত্মপ্রকাশের পরিকল্পনা করছে।

এজন্য পাঁচ সদস্যের কমিটিও গঠন করেছে দলটি। যদি নিষিদ্ধ হয় তবে জামায়াত নতুন নামে আসবে। তবে দল হিসেবে নিষিদ্ধ হলেও কিংবা নতুন নামে পুনর্গঠিত হলেও আদর্শ বদলাবে না জামায়াত। জামায়াতে ইসলামীর একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার বক্তব্যে উঠে এসেছে এমনই আভাস।

স্বাধীনতা যুদ্ধে ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হলেও দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেয়নি। স্বাধীনতার বিরোধিতা করায় জনগণের কাছে ক্ষমা না চাওয়া ও যুগোপযোগী সংস্কার আনতে না পারায় সম্প্রতি দলের সিনিয়র নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক পদত্যাগ করেন। একই দাবি নিয়ে সরব শূরা সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জুকেও বহিষ্কার করে জামায়াত। এরপরই জামায়াতে ইসলামীর নাম পাল্টে নতুন নামে আত্মপ্রকাশের বিষয়টি চাউর হয়।

জামায়াতে ইসলামীর একাধিক ইউনিটের নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা জামায়াতে ইসলামী নতুন দল গঠনের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। এ কমিটির প্রধান করা হয় দলের সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমানকে। যদি জামায়াতে ইসলামীকে সরকার নিষিদ্ধ করে তবেই নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ও কার্যক্রম প্রকাশ্যে আসবে। তার আগে নতুন নামে প্রকাশ্যে আসতে চায় না দলটি। এ সময় জামায়াতে ইসলামীর স্বাভাবিক সক্রিয়তা চলমান থাকবে।

নেতাকর্মীদের কাজে মনোযোগী হওয়ার নির্দেশ

জামায়াতের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, চার দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালায় জামায়াতে ইসলামী। সেগুলো হলো দাওয়াত ও তাবলিগ (চিন্তার পরিশুদ্ধি ও পুনর্গঠন), সংগঠন-প্রশিক্ষণ, সমাজসংস্কার-সমাজসেবা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও সংশোধন। ৪ নম্বর দফাটিই জামায়াতের রাজনৈতিক রূপ। জামায়াত আপাতত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বাকি তিন দফাকে।

জেলা জামায়াতের একজন সেক্রেটারি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় জামায়াত নির্দেশনা দিয়েছে- জামায়াতের কেন্দ্রীয় শূরার সিদ্ধান্ত ছাড়া দলের অন্য কারো বা বাইরের কারো কোনো কথা সাংগঠনিক হবে না। একই সঙ্গে, রাজনীতির মাঠ ছেড়ে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সমাজসেবা, সংস্কারমূলক কাজ-কর্ম এবং দাওয়াতে তাবলিগি কাজে বেশি মনোযোগী হবার নির্দেশনা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাঠের রাজনীতিতে আমাদের সক্রিয়তা নেই মানে এই নয় যে আমরা বসে আছি। আমাদের কাজ পুরোদমেই চলছে।’

রাজনৈতিক মাঠে সরব থাকবে না জামায়াত

ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা ও বর্তমানে জেলা জামায়াতের একজন দায়িত্বশীল বলেন, ‘দেশে রাজনীতির পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছে। ভোটের অধিকার খর্ব করা হয়েছে। পুরো বিশ্ব দেখেছে এবার নির্বাচনটা কীভাবে হয়েছে। এরপর আর ঝুঁকি নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ভোটের মাঠে নামছে না। তাই উপজেলা নির্বাচন বয়কট করেছে জামায়াতে ইসলামী। মাঠের রাজনীতির বাইরে আরও যেসব নিয়ে সংগঠন কাজ করে সেসব চলছে স্বাভাবিক নিয়মে।’

নতুন দল হলেও বিলুপ্ত হবে না জামায়াত

জামায়াতে ইসলামীর উচ্চপর্যায়ের একাধিক দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যুদ্ধাপরাধের দায়ে সরকার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করলেও বিলুপ্ত হবে না জামায়াত। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের এক নেতা বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে যদি আদালত জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে তবেই নতুন দল কার্যক্রম শুরু করবে। তবে বিলুপ্ত হবে না জামায়াত। বরং নতুন দলে জামায়াতেরই কর্তৃত্ব ও প্রভাব থাকবে।

আদর্শ বদলাবে না জামায়াত
গঠনতন্ত্র অনুসারে জামায়াতে ইসলামীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো কোরআনে বর্ণিত আল্লাহর আইন অনুসারে সমগ্র রাষ্ট্রে পরিপূর্ণ ইসলামী শাসনতন্ত্র কায়েম করা। ইসলামকে বিভক্তির হাত থেকে রক্ষা করে সমগ্র রাষ্ট্রে কোরআনের বিধান সম্পূর্ণরূপে কায়েম করবার জন্য চেষ্টা ও সাধনা করা এবং আল্লাহর নির্দেশিত অবশ্য পালনীয় কর্তব্যসমূহ যেমন নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাত ইত্যাদি পালনে নাগরিকদের সচেতন করা।

এসবের মাধ্যমে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সর্বপ্রকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক হুমকি এবং বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করা। দায়িত্বশীল নাগরিক এবং চরিত্রবান ও যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে শোষণহীন সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করে জনসাধারণের সামগ্রিক কল্যাণ সাধন করা এবং বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা। তবে ২০১২ সালের অক্টোবরে সংশোধিত গঠনতন্ত্রে দলটি ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা সংযুক্ত করেছে।

নিষিদ্ধ হলে ও নতুন দল গঠনে কি জামায়াতের আদর্শ বদলাবে? জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আব্দুল হালিম  বলেন, ‘যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাছিলের জন্য জামায়াতে ইসলামী গঠিত হয়েছিল তা পরিবর্তনের প্রশ্নই আসে না। জামায়াতকে এর আগেও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু আদর্শ বদল হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে না।’

তিনি বলেন, ‘মিসরে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছে মুসলিম ব্রাদারহুড থেকে। মুসলিম বিশ্বে ইসলামপন্থী যত আন্দোলন চলমান রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো মুসলিম ব্রাদারহুড। দশকের পর দশক এই সংগঠনটি মিশরে নিষিদ্ধ ছিল। এর নেতা-কর্মীরা যুগের পর যুগ হয়রানির শিকার হয়েছে। সেখানে মুসলিম ব্রাদারহুড কিন্তু অসংখ্যবার নিষিদ্ধ হয়েছিল। সম্প্রতি ফের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ হয়েছে দলটি। অথচ মিশরে কিন্তু ’৭১ প্রশ্ন ও দ্বিধা নাই। বাংলাদেশেও জামায়াতে ইসলামী একই কারণে হয়রানি জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নিষিদ্ধ হয়েছে। ফের নিষিদ্ধ করার পায়তারা চলছে। সেখানে ৭১-এ জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রাখা তো বিতর্ক করার জন্যই। সুতরাং জামায়াত নিষিদ্ধ হলেও আদর্শ বদলাবে না।’

জামায়াত বিষয়ে কথা হয় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘জামায়াত নতুন নামে আসলেও দেখার বিষয় তাদের আদর্শ। তারা কি আগের ধারাতেই রাজনীতি করতে চায় নাকি মওদুদিবাদ ত্যাগ করে সংবিধান মেনে রাজনীতি করতে চায়-সেটাই দেখার বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘দল বা ব্যক্তিকে নিষিদ্ধ বড় বিষয় নয়, বড় বিষয় তাদের আদর্শ। ইউরোপের যেমন নাৎসিবাদ প্রচার নিষিদ্ধ তেমনি মওদুদিবাদ নিষিদ্ধ করতে হবে। তবেই বন্ধ হবে জামায়াতের ধর্মের নামে রাজনীতি। বন্ধ হবে-রগ কাটা, গলা কাটা, আগুন সন্ত্রাসের রাজনীতি।’

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির অন্যতম পর্যবেক্ষক ও সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান বলেন, ‘আমার জানা মতে, জামায়াত সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য তৈরি আছে এবং খুব দ্রুতই তারা নতুন নামে দল দিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হবে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জন্মতো ১৯৭৯ সালে। তাই এই জামায়াতের ওপর এর আগের কোনো দায় চাপানো যায় না। আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তির বিচার করা যায়, দলের করা যায় না। সেদিক থেকে আমার মনে হয়, আইনগত ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব হবে না। আর এ কাজটি সরকার করবে না।’

সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদি ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট লাহোরের ইসলামিয়া পার্কে সামাজিক-রাজনৈতিক ইসলামী আন্দোলনের অংশ হিসেবে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ নামে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর জামায়াতে ইসলামী মূলত ভারত ও পাকিস্তান দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের শাখা থেকে সৃষ্টি হয়।

১৯৬২ সালে আইয়ুব খান প্রণীত মুসলিম পরিবার আইন অধ্যাদেশের বিরোধিতা করার কারণে ১৯৬৪ সালের ৪ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তীব্র বিরোধিতা করে।

১৯৭১ সালের পর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলে জামায়াতও এর আওতায় পড়ে। ১৯৭৬ সালের আগস্টে জিয়াউর রহমান সরকার সকল ধরনের রাজনৈতিক দলের রাজনীতি উন্মুক্ত করে রাজনৈতিক দল অধ্যাদেশ ঘোষণা করেন। এ সময় ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি নামক একটি দলের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী যুক্ত ছিল। পরে গোলাম আযম বাংলাদেশে ফিরে এলে ১৯৭৯ সালের মে মাসে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ গঠিত হয়।