• এপ্রিল ১৭, ২০১৯
  • লিড নিউস
  • 23
সুনামগঞ্জে হাওরের পতিত জমিতে ফলছে দ্বিগুণ ধান

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: এই তো, এক দশক আগের কথা, গরমের মৌসুমে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওরের বিস্তর ভূমি কাঠ হয়ে পড়ে থাকতো। দশ হাজার টাকা বিঘাতেও এসব জমি কেউ কিনতে চাইতো না। অন্তহীন দুর্দশায় ডুবে ছিল এলাকার কৃষকরা। তবে দিন বদলে গেছে। সেচ প্রকল্পের আওতায় এই হাওরের প্রায় চার হাজার একক পতিত জমি এখন সুজলা-সুফলা ভূমিতে পরিণত হয়েছে। ধানের উৎপাদন দ্বিগুণ বেড়েছে। কৃষকের মুখের হাসি প্রসারিত হয়েছে। বিঘাপ্রতি পাঁচ লাখ টাকা দাম করলেও এসব জমি আর কেউ বেঁচতে চান না।

কিন্তু কেমন ছিল এর আগের পরিস্থিতি? সেই বিষয়ে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা হয়।

সেচ-সংকটের কারণে দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক মরম আলী বলেন, ‘সেচ-সুবিধা না পাওয়ায় আমাদের জমিগুলো পতিত ছিল। হাওরজুড়ে জমি থাকলেও কোনও ধান পেতাম না। অভাব অনটনে দিন কাটতো। সবাই বৈশাখ মাসে ঘরে ধান তুললেও আমরা কোনও ধান তুলতে পারতাম না।’

এই গ্রামের সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘হাওর ভইরা জমি থাকার পরও এলাকার মানুষ এক ছটাক ধান পেতো না। পরিবার নিয়ে মানবেতন জীবন কাটাতো।’

প্রবীণ কৃষক আবু হানিফ বলেন, ‘আগে জমিগুলো ১০ হাজার টাকা বিঘাও দাম হতো না, আর এখন প্রতিবিঘার দাম ৫ লাখ টাকা দিলেও কেউ বিক্রি করে না।’

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘এখন থেকে ২০ বছর আগে হাওরের জমি চাষাবাদ করতে পানির কোনও সংকট ছিল না। সীমান্তের ওপাড় থেকে নদী তে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে কোটি কোটি ঘনফুট বালি নেমে আসায় নষ্ট হয়ে যায় হাওরের পানি প্রবাহের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা। ফলে তিন-চার বছরের মধ্যে পতিত হয়ে যায় কয়েক হাজার বিঘা জমি। এতে আলীপুর, চালবন, রামপুর, জগন্নাথপুর, লামাপাড়া, তালেরতল, ভাদেরটেক, গাজীরগাঁও গ্রামের পাঁচ শতাধিক কৃষকের জমির চাষবাদ বন্ধ হয়ে যায় শুধু সেচ সংকটের কারণে।’

আরও জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) ২০১০ সালে ভূগর্ভস্থ সেচনালার মাধ্যমে ডাবল লিফটিং সেচ প্রকল্প চালু করে। এই প্রকল্প চালু হওয়ার সময় পাঁচ গ্রামের ১২৩ জন কৃষক প্রকল্পের আওতায় ছিল। বর্তমানে কৃষকের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। আগে যাদের জমি সেচ সংকটের কারণে পতিত ছিল, তারা এখন জমিতে উচ্চ ফলনশীল ধান চাষাবাদ করছেন।

মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আমিন বলেন, ‘আগে জমিতে পানি যেতে দুই-তিন দিন লাগতো, কারণ অনেক জমির ওপর দিয়ে পানি গিয়ে খালে পড়তো, এজন্য পানির অপচয় হতো। কিন্তু ভূগর্ভস্থ নালা চালু হওয়ায় একদিনের মধ্যে জমিতে সেচের পানি পাওয়া যায়।’

চালবন গ্রামের কৃষক আলা উদ্দিন মিয়া বলেন, ‘সময় মতো জমিতে পানি সেচ দিতে পারায় ধানের উৎপাদন দ্বিগুণ বেড়েছে। আগে বিঘাপ্রতি ফলন ছিলো ৭ থেকে ৮ মণ, আর এখন বিঘাতে গড়ে ২০ মণ ধান উৎপাদন করা যায়।

চালবন-জগন্নাথপুর-রামপুর বহুমুখী সেচ প্রকল্পের পরিচালক মো. হারিছ মিয়া বলেন, ‘সেচ প্রকল্পের বিদ্যুৎ বিল বাণিজ্যিকহারে নির্ধারণ হওয়ায় খরচ দ্বিগুন বেড়েছে। আগে কৃষকরা বিঘাপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দিতেন, এখন ৭০০ টাকা করে দিতে হয়। এতে কৃষকের পাশাপাশি প্রকল্পের লোকজনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিদ্যুতের বিল কমানো না হলে, আগামীতে তারা প্রকল্প সারেন্ডার করবেন।’

এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী হুসাইন মুহাম্মদ খালিদুজ্জামান বলেন, ‘বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের অক্ষয়নগর মৌজায় খরচার হাওর সুনামগঞ্জের খাদ্য ভাণ্ডারগুলোর মধ্যে অন্যতম। সেচ সুবিধার অভাবে এই হাওরের চার হাজার একর জমি পতিত ছিল। এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে খরচার হাওরে ডাবল লিফটিং রামপুর ২৫ কিউসেক ভাসমান প্রকল্প গ্রহণ করে বিএনডিসি। পরে ভূগর্ভস্থ সেচনালার মাধ্যমে জমিতে পানি সেচের ব্যবস্থা করা হয়। এতে কৃষক স্বল্প সময়ে জমিতে সেচের পানি নিতে পারায় ফসলের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ বিল বেশি আসায় কৃষকরা অনেকটা সমস্যায় মধ্যে পড়েছেন। এই বিল কমানো গেলে কৃষক আরও বেশি উপকৃত হবেন।’