• মে ১২, ২০১৯
  • মতামত
  • 47
সুপারবাগ : আতঙ্ক ও বাস্তবতা

ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল: সুপারবাগ নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে চারপাশে। সুপারবাগ কি শেষ পর্যন্ত মানব সভ্যতার জন্য বড় হুমকি হয়ে আসছে? মানবজাতি কি শেষ পর্যন্ত সুপারবাগেই কুপোকাত হবে? নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে পৃথিবী থেকে?

সুপারবাগ নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মনে। বর্তমানে অনলাইনে নানা লেখায়, ইন্টারভিউতে, বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় উঠে আসছে সুপারবাগ ইস্যু।

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে জেনে নিই, সুপারবাগ আসলে কী?

সুপারবাগ আসলে আলাদা কিছু নয়, ব্যাকটেরিয়াগুলো যখন অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তখন তাকে বলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া। এরই আরেক নাম সুপারবাগ।

কীভাবে জন্ম নেয় সুপারবাগ?

এটা আসলে এক ধরনের জীবের বিবর্তন। একটি অ্যান্টিবায়োটিক যখন দিনের পর দিন ব্যবহৃত হতে থাকে, তখন প্রকৃতির নিয়মেই ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেদের জিনে বিশেষ কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এটি ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্বের লড়াই। একে বলে সারভাইভাল ইন্সটিংক্ট।

এটা কি নতুন কিছু?

না, এটি নতুন কিছু নয়। অ্যান্টিবায়োটিকের ইতিহাস খুব বেশিদিনের নয়। মাত্র ৮০ বছর আগে অ্যান্টিবায়োটিক আসে পৃথিবীতে। এর আগ পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক বলে কিছু ছিলই না।

অ্যান্টিবায়োটিক-পূর্ব সময়ে মানুষ জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করত নিজেদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সম্বল করে। খুব যে পেরে উঠত, তাও নয়। সিফিলিস, প্লেগ, কলেরার মতো সংক্রামক রোগে মানুষ মারা যেত হাজারে হাজারে।

আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কারের পর একটা জাদুকরি পরিবর্তন এলো। সবাই বিস্ময় নিয়ে খেয়াল করল সিফিলিস, টাইফয়েড, ক্ষত সংক্রমণের মতো অসুখ সহজেই ভালো হয়ে যাচ্ছে। সবাই একে ‘মিরাকল’ বলে আখ্যা দিল। কিন্তু পেনিসিলিন আবিষ্কারের ১০ বছর না যেতেই, এমনকি পেনিসিলিন আবিষ্কারের জন্য বিজ্ঞানী ফ্লেমিং নোবেল পাওয়ার আগেই পেনিসিলিন প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া আবির্ভূত হলো। ব্যাকটেরিয়াগুলো তাদের কোষ আবরণীর চারপাশে প্রোটিনের বিশেষ প্রাচীর তৈরি করল, যা ভেদ করে পেনিসিলিন ভেতরে ঢুকতে পারে না।

কিন্তু বিজ্ঞানও থেমে থাকেনি। নতুন নতুন প্রযুক্তির অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করে ব্যাকটেরিয়াকে ধরাশায়ী করেছে। এভাবেই চলেছে গত ৮০ বছর।

কিন্তু হঠাৎ সুপারবাগ নিয়ে এত হৈচৈ কেন?

হৈচৈ এ কারণে যে নানা কারণে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের হার বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। নতুন নতুন জেনারেশনের অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়ে বেশি গতিতে বাড়ছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া।

কেন বাড়ছে?

বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক নামক মোক্ষম অস্ত্রটি সহজলভ্য হওয়ায় বেড়েছে এর যথেচ্ছ ব্যবহার। এটাই প্রধান কারণ। প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওভার দ্য কাউন্টার (প্রেসক্রিপশন ছাড়া ভোক্তার নিজের ইচ্ছায়) অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া, পুরো কোর্স না খাওয়া, অর্থাৎ মাঝপথে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া ছেড়ে দেওয়া ইত্যাদির জন্য সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে সুপারবাগ। আন রেজিস্টার্ড হাতুড়ে চিকিৎসক কর্তৃক (অনেক সময় রেজিস্টার্ড ডাক্তারও) আন্দাজে ঢিল ছোড়ার মতো অহেতুক অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হয়েছে আইসিইউতে ঘাপটি মেরে থাকা এক ধরনের প্রতিরোধী জীবাণু। এগুলো হাসপাতাল বা আইসিইউতেই থাকে। নানা রকম অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে তারা প্রতিরোধী হয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে। আইসিউতে ভেন্টিলেটর সার্কিটসহ বিভিন্ন যন্ত্র নিয়মিত জীবাণুমুক্ত না করলে এবং একই যন্ত্র জীবাণুমুক্ত না করে বারবার ব্যবহার করলে সুপারবাগের জন্ম হয়। আমাদের দেশের আইসিইউগুলোতে এই সমস্যা বাড়ছে।

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা বেশ ভীতির জন্ম দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউতে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৯০০ রোগীর ভেতর ৪০০ রোগী মারা গেছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার কারণে। সর্বোচ্চ মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েও এদের সরানো যায়নি।

এটি একটি বিরাট অশনিসংকেত। বিএসএমএমইউর আইসিইউ তবু অনেকখানি নিয়ন্ত্রিত ও মানসম্পন্ন। এ দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে যেসব আইসিইউ, সেখানে কী হচ্ছে তা কল্পনা করলেও ভয় হয়।

তাহলে করণীয় কী?

করণীয় হলো রেজিস্টার্ড এমবিবিএস ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসিওয়ালা, হাতুড়ে ডাক্তার, চিকিৎসা সহকারী কারো পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া যাবে না। নিজের ইচ্ছায় তো নয়ই। রেজিস্টার্ড ডাক্তার প্রেসক্রাইব করলে পুরো কোর্সের অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে, একদম নিয়ম মেনে। মাঝপথে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করা যাবে না। ডাক্তারদেরও অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করার ক্ষেত্রে সাবধান হতে হবে।

আইসিইউগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তারা নিয়মিত জীবাণু নিরোধক কার্যক্রম পরিচালনা করে কি-না, সেটা তদারক করতে হবে।

উন্নত দেশে সুপারবাগ নিয়ে বেশ তোড়জোড় চলছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যেসব দেশে সুপারবাগের জন্ম হচ্ছে বেশি, সেইসব তৃতীয় বিশ্বের দেশে একে নিয়ে তেমন সচেতনতা বা কর্মকাণ্ড নেই।

সুপারবাগের ফলে মানবজাতি ধ্বংস হয়ে যাবে, এ রকম কথা বলা যায় না। কিন্তু মানুষের মৃত্যুহার বেড়ে যাবে অনেকগুণ। বিরূপ প্রভাব পড়বে সামষ্টিক অর্থনীতিতেও। সময় থাকতে সচেতন না হলে মানবজাতি নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এটা নিশ্চিত বলা যায়।

লেখক : রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।