• মে ২৭, ২০১৯
  • মতামত
  • 53
ব্যবসায়ীর লাভ আর পাবলিকের হাতে হারিকেন!

চিররঞ্জন সরকার: এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে রমজানে তেল, চিনিসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম না বাড়াতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘পবিত্র রমজান মাসে’ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম একটুও বাড়বে না বরং কমবে’— ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর এমনটা জানিয়েছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। ‘পবিত্র রমজান মাসে জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা এবার কঠোর হবো’, এমন মন্তব্য করেছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। রমজান শুরুর পর বিশেষ অভিযান, তদারকি সেল, মোবাইল কোর্ট অনেক কিছুই চালু করা হয়েছে। কিন্তু সব আবেদন-নিবেদন হুমকি-উদ্যোগকে কলা দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা জিনিসপত্রের দাম ঠিকই বাড়িয়ে দিয়েছেন। এবার রমজানেও সবকিছুরই দাম চড়া।
অবশ্য আমাদের দেশে জীবনের দাম বাড়ে না, সৃজনশীলতা বা স্বপ্নের দাম বাড়ে না, এমনকি মানুষের দামও বাড়ে না, বাড়ে শুধু বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। এই দাম শুধুই বাড়ে। কারণে বাড়ে, অকারণে বাড়ে। বাড়তেই থাকে। দাম বাড়ার জন্য কোনও কারণও লাগে না। জিনিসপত্রের দাম বাজেটের আগে বাড়ে, পরেও বাড়ে। ঝড়, বৃষ্টি হলে বাড়ে, না হলেও বাড়ে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাম বাড়লেও বাড়ে। নির্বাচিত ‘ঢিলে-ঢালা’ সরকারের শাসনামলে বাড়ে, এমনকি অনির্বাচিত ‘শক্ত’ সরকারের আমলেও বাড়ে। রমজানের আগে বাড়ে, পরেও বাড়ে। দাম একবার বাড়লে তা আর কমে না। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাম কমলেও আমাদের দেশে দাম কমে না। এমনকি দেশে বাম্পার ফলন হলেও খাদ্যশস্যের দাম কমে না। মানুষের বয়সের মতো, আমাদের জীবনের সামগ্রিক হতাশার মতো জিনিসপত্রের দাম কেবল বাড়ে, বাড়তেই থাকে।

দাম আপনা-আপনি বাড়ে না, বাড়ানো হয়। বলা বাহুল্য, এ দাম বাড়ার ক্ষেত্রে আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, আড়তদার, চাঁদাবাজ, আন্তর্জাতিক বাজার ইত্যাদির ভূমিকা থাকলেও সরকারি নীতির ভূমিকাও উপেক্ষণীয় নয়। তবে আশার কথা হচ্ছে, এসব নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ থাকলেও বড় বেশি ক্ষোভ নেই। এরও অবশ্য কারণ আছে। আমাদের দেশের শাসকরা নানা কৌশলে মানুষের সহ্যশক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে যদি একটু একটু করে নির্যাতন করা হয়, আঘাত করা হয়, তাহলে এক সময় তা সয়ে যায়। এরপর আঘাতের মাত্রা বাড়ালেও খুব একটা ভাবান্তর হয় না। আমাদের দেশের মানুষকেও একটু একটু করে আঘাত ও নির্যাতন চালিয়ে সর্বংসহা বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন মানুষ ভীষণ অসন্তুষ্ট হলেও খুব একটা বিক্ষুব্ধ হয় না।

আমরা অবশ্য তারপরও মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মাথা ঘামাই। এটা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাতেই হয়। কারণ বাঁচার জন্য আমাদের খেতে হয়, জিনিসপত্র কিনতে হয়; কাজেই দাম যত বেশিই হোক প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আমাদের সংগ্রহ করতেই হবে। কম হোক, বেশি হোক, ভাত হোক আলু হোক, আমিষ হোক আর নিরামিষ হোক, সাপ-ব্যাঙ কুকুরই হোক, আর মরা মুরগি, রাসায়নিক মিশ্রিত সবজিই হোক, খেতে হবেই। না খেয়ে মানুষ বাঁচে না। বাঁচতে পারে না।

জিনিসপত্রের দাম ক্রমাগত কেন বাড়ছে, কী পরিমাণ বাড়ছে, এতে সরকারের ভূমিকা কতটুকু, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব কতটুকু আর ব্যবসায়ী বা মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি কতটুকু, এই দাম বাড়ার ফলে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো, এর পরিণামই বা কী, এসব বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা ও গবেষণা হয়েছে, এখনও হচ্ছে, আশা করা যায় ভবিষ্যতে আরও অনেক হবে। কিন্তু তাতে পরিস্থিতি বদলায়নি; হয়তো বদলাবেও না। বাজারদর এখনও চড়া। চাল-ডাল, তরিতরকারি, চিনি-তেল, মাছ-মাংস, ডিম, দুধসহ প্রায় সব জিনিসপত্রের দামই বেশি।

এই দাম বেড়ে যাওয়া নিয়েও আছে পরস্পরবিরোধী মন্তব্য। সরকার দোষ দেয় ব্যবসায়ীদের। তাদের অতিমুনাফার লোভ আর মজুতদারি মানসিকতার কারণে দাম বাড়ে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়। পক্ষান্তরে ব্যবসায়ীরা বলেন নানা কথা। তাদের মতে, উৎপাদন কম হওয়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, চাঁদাবাজি, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণেই মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। দাম বাড়ার জন্য ব্যবসায়ীরা ইদানীং ক্রেতাদের দোষ দেন। ক্রেতারা এক কেজি লাগলে পাঁচ কেজি কেনেন, তাতে দাম বাড়ে বলে মন্তব্য করেছেন এক ব্যবসায়ী! পক্ষান্তরে ক্রেতাদের কেউ কেউ এমন কথাও বলেন, আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা ১১ মাস করে চুরি আর ১ মাস মানে রমজান মাসে করে ডাকাতি! দাম বাড়ার জন্য ব্যবসায়ী-সরকার-ক্রেতা একে-অপরকে দায়ী করছে। তাতে অবশ্য জিনিসের দাম কমছে না!

আসলে ব্যবসায়ীদের দোষ দিয়েও লাভ নেই। কারণ তারা যে কোনও উপায়ে কীভাবে মুনাফা বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টা সততার সঙ্গেই করেন। তাদের ধর্মের দোহাই দিয়ে, রমজানের ফজিলতের কথা বলে লাভ বা মুনাফার আকাঙ্ক্ষা থেকে সরিয়ে আনা যাবে না। আর তাই রমজান মাসে আমাদের দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও ‘নিয়তি’ হিসেবেই মেনে নিতে হবে!

আমাদের সমাজে ব্যবসায়ীদের ইমেজ খুব একটা ইতিবাচক নয়। সৎ পথে থেকে সৎভাবে ব্যবসা করে বড় লাভের মুখ দেখা সম্ভব নয়, এমন একটা বদ্ধমূল ধারণা আমরা লালন করি। যারা ব্যবসা করেন, তারা চোরাপথে মাল কিনে, শ্রমিক-কর্মচারীদের ঠকিয়ে, ভেজাল বা নিম্নমানের জিনিস মিশিয়ে, ওজনে কম দিয়ে, মজুতদারি করে, দাম বাড়িয়ে, ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে বড়লোক হন বলে অনেকের বিশ্বাস।

তবে ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল কথাই হচ্ছে লাভ। যে কোনও উপায়ে লাভ করাই একজন ব্যবসায়ীর প্রধান লক্ষ্য। শুধু লাভ নয়, মহালাভ খোঁজেন তারা। লাভ করতে গিয়ে কোনো ঝুটঝামেলা, ইনকাম ট্যাক্স, সেলস ট্যাক্স, কাস্টমস, পুলিশ, মামলা, অসন্তোষ, হরতাল, ধর্মঘটে জড়িয়ে না পড়েন, ব্যবসায়ীদের মনে এই আকাঙ্ক্ষাও প্রবলভাবে কাজ করে। ব্যবসা করা অবশ্য সহজ কাজ নয়। অনেক ঝানু ব্যক্তি ব্যবসা করতে গিয়ে ফতুর হয়েছেন, আবার অনেক হাঁদারামও ব্যবসায় সফল হয়ে কোটিপতি বনেছেন। উভয় প্রকার উদাহরণই আমাদের সমাজে ভূরিভূরি আছে। প্রখর বুদ্ধি, কূট-কৌশল, কঠোর পরিশ্রম, অমিত আত্মবিশ্বাস, সেইসঙ্গে ভাগ্যদেবীর সুনজর— এসব না হলে ব্যবসায় সফল হওয়া যায় না।

হ্যাঁ, সেইসঙ্গে সততাও প্রয়োজন। আমরা ছোটবেলায় দেখতাম দোকানে কাচের ফ্রেমে বাঁধানো রয়েছে, সততাই আমাদের একমাত্র মূলধন। আজকাল অবশ্য এরকম কোনও ঘোষণাপত্র কোনও দোকানে বা শোরুমের দেয়ালে দেখা যায় না। পুরো সমাজ থেকেই যেখানে সততা বিদায় হয়েছে, সেখানে দোকানে তা আর টিকে থাকবে কীভাবে? ব্যবসায় সততা বলতে যে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই তেমন নয়, সততা এখনও আছে। তবে তা ভিন্ন সংজ্ঞায়, আলাদা মানে নিয়ে। এ প্রসঙ্গে একটি গল্প বলা যাক।

এক বৃদ্ধ ব্যবসায়ী তার শিশু নাতিকে নিয়ে নিজের দোকানে এসেছেন। তিনি নাতিকে নিয়ে ক্যাশবাক্সের পেছনে গদিতে বসেছেন, পাশের দেয়ালেই ‘সততাই আমাদের মূলধন’ বিজ্ঞপ্তি ঝুলছে। নাতি পড়তে শিখেছে। সে ওটা দেখে পিতামহকে প্রশ্ন করলো, ‘দাদু সততা কী?’ দাদু বললেন, ‘সততা একটা খুব খাঁটি জিনিস। চট করে বোঝানো কঠিন। মনে কর আমি আর তুমি এ ব্যবসার অংশীদার। এখন একজন গ্রাহক এসে একটা জিনিস কিনে ১০ টাকা দিতে গিয়ে ভুল করে ২০ টাকার নোট তোমাকে দিয়ে চলে গেলো। তুমিই ক্যাশবাক্সে বসেছ, তোমার অংশীদার আমি দোকানের অন্যদিকে রয়েছি। আমি দেখতে পাইনি গ্রাহক ভুল করে ১০ টাকা বেশি দিয়েছে। এখন তুমি যদি ওই ১০ টাকা থেকে আমাকে ৫ টাকা দাও তাহলে সেটাই হলো তোমার সততা।’

নাতি বললো, ‘কিন্তু দাদু গ্রাহক…!’

দাদু বললেন, ‘গ্রাহকের কথা ভেব না, ওটা বাদ দাও।’

ব্যবসা বড় বিচিত্র জিনিস। কীসে কত লাভ— সেটা দোকানদার ছাড়া কেউ জানে না। যখন দোকানদার বলছে, স্যার আপনাকে আমি কেনা দামে জিনিস দিচ্ছি, তখন সে ডাহা মিথ্যা কথা বলছে। আর একটা কথা মনে রাখা উচিত, ব্যবসায়ে মিথ্যা বলা ব্যবসায়ীর কাছে মোটেও ‘পাপ’ নয়, বরং সেটাই তার ‘ধর্ম’। ব্যবসার আসল কথা হলো লাভ, তা সে যেভাবেই হোক। লাভের জন্য ব্যবসায়ীরা যা বলেন, যা করেন সবই তার জন্য ‘সততা’ বা ‘ন্যায়’।

আগে মোটা অঙ্কের চাঁদার বিনিময়ে ব্যবসায়ীরা সরকারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতেন। তাদের স্বার্থের পক্ষে নীতি ও আইন প্রণয়নের জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো। বর্তমানে ব্যবসায়ীরাই রাজনীতিবিদ, রাজনীতিবিদরাই ব্যবসায়ী। এখন আর তোয়াজ-তোষামোদের বালাই নেই। এখন তারাই সর্বেসর্বা। তারা নিজেদের স্বার্থে আইন প্রণয়ন যেমন করছেন, নিজেদের প্রয়োজনে সেই আইনকে বুড়ো আঙুলও দেখাচ্ছেন। দেখারও কেউ নেই আর বলারও কিছু নেই। অনুসন্ধান করে দেখুন, প্রধানমন্ত্রী এবং দু’চারজন ছাড়া বাকি সবাই প্রায় নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কাজেই তারাই এখন নীতিনির্ধারক। দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। আমাদের মতো আম-পাবলিকের হারিকেন হাতে নিয়ে বসে থাকা ছাড়া অন্য কোনও ভূমিকা আছে বলে মনে হয় না!

লেখক: কলামিস্ট।