• জুলাই ১৬, ২০১৯
  • মৌলভীবাজার
  • 61
কমলগঞ্জে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত, কমতে শুরু করেছে নদীর পানি

মৌলভীবাজার প্রতিনিধিঃ মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় শতাধিক গ্রাম বন্যায় তলিয়ে গেছে। এ অঞ্চলে দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। আশঙ্কা করা হচ্ছে পানিবাহিত নানা রোগের। আর প্রশাসন পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা না করায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) সকালে বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কমলগঞ্জে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো হলো- পৌরসভা, রহিমপুর এবং আদমপুর। উপজেলার পৌর এলাকা ও ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় ত্রিশটি গ্রামের বিশ হাজার মানুষ গত চারদিন ধরে পানিবন্দি রয়েছেন। এসব এলাকার ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট, নলকূপ ও ফসলের খেত তলিয়ে গেছে। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট। মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন তারা।

এছাড়াও উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকাগুলো হলো- কমলগঞ্জ পৌরসভা, সদর ইউনিয়ন, আলীনগর ইউনিয়ন, সমশেরনগর ইউনিয়ন, পতনঊষার ইউনিয়ন, মুন্সিবাজার ইউনিয়ন, রহিমপুর ইউনিয়ন, আদমপুর ও ইসলামপুর ইউনিয়ন। এ সব ইউনিয়েনে প্রায় শতাধিক গ্রামের কয়েক লক্ষ মানুষ এখনও পানিবন্দি।

সোমবার (১৫ জুলাই) রাতে আদমপুর ইউনিয়নের ছোট ঘোড়ামারা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের একটি অংশ পুরোটাই পানির নিচে। পাকা ব্রিজের কয়েক মিটার ওপরে পানির গতিপ্রবাহ। মানুষের ঘরবাড়িও পানির নিচে।

গত শুক্রবার (১২ জুলাই) রাত থেকে ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ধলাই নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে প্রায় অর্ধ শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে ঘর, আসবাবপত্র, ফসল, হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু।

কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এলাকার প্রায় ১০০ হেক্টর ফসলি জমি অংশিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

উপজেলা মৎস্যবিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৪৮টি ছোট-বড় পুকুর, দিঘি এবং মাছের খামার এ বন্যায় মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এদিকে, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের ধলাই নদীতে সোমবার দুপুর থেকে পানি কিছুটা কমলেও বিকেলের দিকে আবার পানি বেড়ে কুমড়াকাপন সংলগ্ন রামপাশা গ্রামে নতুন একটি প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়।

ঘোড়ামারা গ্রামের কৃষ্ণ সিংহ বলেন, আমাদের এখানে ধলাই নদীর একটি বাঁধ আছে। এই বাঁধটি অনেক দিন থেকে ভাঙা। আজ পর্যন্ত কেউ এর ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করেনি। মেরামত করলে হয়তো পানি এভাবে আমাদের গ্রামের ভেতরে আসতো না। আমাদের গ্রামের একটি অংশ এখনও পানির নিচে। আমরা যেখানে ধান রোপন করেছিলাম সেই ফসলি জমি সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। কিছু স্থানে আমাদের সবজি খেতের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমাদের এলাকায় ত্রাণসামাগ্রীও আসেনি।

রামপাশা গ্রামের প্রত্যুষ ধর বলেন, আমার বাড়ির সামনের দিকে রোববার গভীর রাতে আকস্মিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধটি ভেঙে যায়। বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন এলাকাবাসী। অনেকেই তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরাতে পারেননি। অনেকের গৃহপালিত গবাদিপশু পানিতে ভেসে গেছে। সরকারের কাছে আমাদের এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো যত দ্রুত সম্ভব মেরামত করে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ইয়াহিয়া বলেন, রহিমপুর ইউনিয়ন, পতনঊষার ইউনিয়ন আর সদর ইউনিয়ন বেশি বন্যাকবলিত। এসব এলাকায় পানিবাহিত রোগের আসন্ন উপস্থিতি দূর করতে আমাদের মেডিক্যাল টিম কাজ করে চলেছে। খাওয়ার স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি, বন্যায় বিভিন্ন রোগব্যাধি থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্যশিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত ইউনিয়নগুলোর জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশেকুল হক বলেন, আবহাওয়া পূর্বাভাস থেকে আমরা জানতে পেরেছি, নদীগুলোতে পানি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। আমাদের ধলাই নদীর পানি বিপদসীমার নিচে রয়েছে এবং এ নদীর পানি কুশিয়ারা নদীতে পতিত হয়ে ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। আমরা আশা করছি বিকেলের মধ্যে অবস্থার অনেক উন্নতি হবে।

বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী সম্পর্কে ইউএনও আরও বলেন, ইতোমধ্যে ৬২টি মেট্রিক টন জিআর (জেনালের রিলিফ) চাল, ২০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বন্যা কবলিত এলাকার মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে আরও ত্রাণসামগ্রী আসলে আমরা দ্রুত সেগুলোও বিতরণ করবো।

‘মাত্র দু’টো বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র’ প্রসঙ্গে ইউএনও আশেকুল জানান, আসলে ভয়াবহ পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি এখানে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে। বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রগুলো তৈরি করে রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় তা ব্যবহার করা যাবে।