• নভেম্বর ২৭, ২০১৯
  • শীর্ষ খবর
  • 86
শুরুতেই হবিগঞ্জের শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজে হরিলুট

নিউজ ডেস্কঃ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বালিশকাণ্ডকেও হার মানিয়েছে হবিগঞ্জ শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজে। প্রধানমন্ত্রীর নামে এই মেডিক্যাল কলেজে প্রতিষ্ঠার শুরুতেই সীমাহীন দুর্নীতির ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। ফেসবুকে ওই কলেজের অধ্যক্ষ আবু সুফিয়ানের অপসারণ দাবিতে শতশত পোস্ট দেওয়া হচ্ছে।

হবিগঞ্জ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) হবিগঞ্জ কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, ঘটনাটি জনস্বার্থের ব্যাপার রয়েছে, তাই কাগজপত্র তৈরি করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে। সেখান থেকে অনুমতি পেলেই নিয়মানুসারে তদন্ত শুরু করবে দুদক।

এ ব্যাপারে কথা বলতে অধ্যক্ষ আবু সুফিয়ানের মোবাইলে বার বার ফোন দেওয়া হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

জানা যায়, ২০১৮ সালের শুরুতেই বইপত্র, সাময়িকী, যন্ত্রপাতি অন্যান্য সরঞ্জমাদি ক্রয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই বছরের ১৭ মে পণ্যের শিডিউল দাখিলও করতে বলা হয়। একই সঙ্গে অধ্যক্ষ (চলতি দায়িত্ব) ডা. আবু সুফিয়ান স্বাক্ষরিত আদেশে বাজার দর মূল্যায়ন এবং টেন্ডার সংক্রান্ত বিষয়ে যাবতীয় পর্যালোচনায় তিনজন প্রভাষককে দিয়ে একটি কমিটি করা হয়।

ওই কমিটির সভাপতি করা হয় ফিজিওলজি বিভাগের প্রভাষক ডা. শাহীন ভূঁইয়াকে। সদস্য ছিলেন বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রভাষক ডা. কুদ্দুস মিয়া এবং ফিজিওলজি বিভাগের প্রভাষক পংকজ কান্তি গোস্বামী। পংকজ গোস্বামীকে কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু দরপত্র মূল্যায়ন রিপোর্টে ওই কমিটির সদস্যদের কোনো সই ছিল না।

টেন্ডারে বরাদ্দ ছিল ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বইপত্র ও মালামাল কেনা হয় ১৫ কোটি ৪৯ লাখ ৭৮ হাজার ৮৫৭ টাকার। ভ্যাট ও আয়কর খাতে সরকারি কোষাগারে জমা হয় ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা ৯৭ হাজার ৭৪৮ টাকা। ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৮১ হাজার ১০৯ টাকা মালামাল ক্রয় বাবদ ব্যয় দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে ওই মালামালের মূল্য পাঁচ কোটি টাকার বেশি নয়। বাকি টাকার পুরোটাই ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে।

মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত মতে, ঢাকার শ্যামলী এলাকার বিশ্বাস কুঞ্জছোঁয়া ভবনের ‘নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ’ নামক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি মালামাল সরবরাহ করে। প্রতিষ্ঠানটি বইপত্র, যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, আসবাবপত্র, মেডিক্যাল ও ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে বিল নিয়েছে ৯ কোটি ৩৭ লাখ ৮৭ হাজার ৪৯ টাকা।

সরবরাহকৃত মালামালের মধ্যে ৬৭টি লেনেভো ল্যাপটপের (মডেল ১১০ কোর আই ফাইভ) মূল্য নেওয়া হয় ৯৯ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতিটির মূল্য পড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা। ঢাকার কম্পিউটার সামগ্রী বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ফ্লোরায় একই মডেলের ল্যাপটপ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪২ হাজার টাকায়। ৬০ হাজার টাকা মূল্যের এইচপি কালার প্রিন্টার (মডেল জেড প্রো এম ৪৫২এন ডব্লিউ) এর দাম নেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯০০ টাকা। ৫০ জন বসার জন্য কনফারেন্স টেবিল, এক্সিকিউটিভ চেয়ার ও সাউন্ড সিস্টেমে ব্যয় হয়েছে ৬১ লাখ ২৯ হাজার টাকা। জনপ্রতি চেয়ার-টেবিল ও সাউন্ড সিস্টেমের ব্যয় পড়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ টাকা। চেয়ারগুলোতে ‘ইয়ামিন ফার্নিচার’ লেখা থাকলেও টেবিলগুলো কোন প্রতিষ্ঠানের এর কোনো স্টিকার লাগানো নেই। দেশের নামিদামি ফার্নিচার প্রতিষ্ঠান হাতিল ও রিগ্যালে এসব চেয়ারের মূল্য ওই দামের অর্ধেকের চেয়েও কম। এছাড়া বিলের ৬ নম্বরে আবারো কনফারেন্স সিস্টেম নামে ৫০ জনের জন্য (জনপ্রতি ২১ হাজার ৯০০ টাকা) ১০ লাখ ৯৯ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত সাধারণ মানের ১৫টি বুক সেলফের মূল্য ৬ লাখ ৬০ হাজার, পাঁচটি স্টিলের আলমিরা ২ লাখ ৮৫ হাজার, ১০টি স্টিলের ফাইল কেবিনেট ৪ হাজার ২২ হাজার, ২৫টি স্টিলের র‌্যাক ১৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি ৬ হাজার ৪৭৫টি বইয়ের জন্য নিয়েছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮ হাজার ৬৬৪ টাকা।

শুধু তাই নয়। মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ১০৪টি প্লাস্টিকের মডেলের মূল্য ১ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৩ টাকা নিয়েছে। দেশের বাজারে ‘পেডিয়াটিক সার্জারি’ (২ ভলিয়মের সেট) বইটির দাম ৩৩ হাজার টাকা। নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ দাম নিয়েছে ৭০ হাজার ৫৫০ টাকা।

রাজধানীর মতিঝিলের মঞ্জুরি ভবনের পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা দরে ৮১টি কার্লজিস প্রিমো স্টার বাইনোকুলার মাইক্রোস্কোপ সরবরাহ করেছে। যার মূল্য নিয়েছে ২ কোটি ৬৩ লাখ ৩২৫ টাকা। বাজারে এর মূল্য ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা। পুনম ইন্টারন্যাশনাল একই কোম্পানি ও মডেলের এসি’র দাম ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা দরে ৩১টির মূল্য নিয়েছে ৬১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ওয়ালটনের যে মডেলের ফ্রিজ ৩৯ হাজার ৩৯০ টাকা, একই কোম্পানি ও মডেলের ফ্রিজের মূল্য গুনতে হয়েছে ৮৫ হাজার টাকা। এ রকম ছয়টি ফ্রিজ কেনা হয়।

ল্যাবরেটরিতে ব্যবহারের জন্য ডিজিটাল ওয়েইং (ওজন মাপার যন্ত্র) মেশিন ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা দাম নেওয়া হয়েছে। যার বাজার মূল্য ৪০ হাজার টাকা। এছাড়া মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ছবি সংবলিত কাগজে ছাপা চার্ট বাজারে ১০০-৫০০ টাকায় পাওয়া গেলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রতিটি চার্ট কিনেছে ৭ হাজার ৮০০ টাকা দরে। এ রকম ৪৫০টি চার্ট ক্রয়ে ব্যয় হয়েছে ৩৫ লাখ ১০ হাজার টাকা।

দেশে ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকায় পাওয়া যায় ‘স্টারবোর্ড’ নামে হিটাচি কোম্পানির ৭৯ ইঞ্চির ইন্টারেক্টিভ বোর্ড। কিন্তু একই কোম্পানি ও মডেলের এই ইন্টারেক্টিভ বোর্ডটি কেনা হয়েছে ১৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়। কম্পিউটার ও প্রজেক্টরের সমন্বয়ে স্পর্শ সংবেদনশীল ইন্টাররেক্টিভ বোর্ডটি লেকচারের কাজে ক্লাসে ব্যবহার হয়। ওই সব মালামালের বাড়তি দাম নিয়ে কানাঘুষা আছে খোদ কলেজেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের দু’জন শিক্ষক বলেন, যেসব বই কেনা হয়েছে এর কিছু বই এমবিবিএস ক্লাসের ছাত্রদের কোনো কাজে লাগবে না। কারণ এসব বই গবেষণার কাজে লাগে। তারা বলেন, শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজের ফার্স্ট ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এখন তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ করেছে। আগামী ২০২২ সালে তারা পঞ্চম বর্ষে পৌঁছাবেন। কিন্তু ২০১৮ সালে পঞ্চম বর্ষে পড়ানোর জন্য বই কিনতে হবে এর কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাই না। বরং শিক্ষার্থীরা নতুন সংস্করণের বই থেকে বঞ্চিত হবে। সরবরাহকৃত বইয়ের মধ্যে ঢাকার নীলক্ষেতে কালার প্রিন্টারে ফটোকপি ও বাঁধাই করা বইও থাকতে পারে বলে অনেকের সন্দেহ। তাদের মতে, ওয়ালটন ও সনি কোম্পানির যে ছয়টি টিভি কেনা হয়েছে তার মূল্যও নেওয়া হয়েছে ২/৩ গুণ বেশি। সুত্র: বাংলানিউজ