• ডিসেম্বর ২৪, ২০১৯
  • শীর্ষ খবর
  • 72
শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের কেনাকাটায় অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি

হবিগঞ্জ প্রতিনিধিঃ হবিগঞ্জের শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজে দরপত্র নীতিমালা অনুসরণ না করে নানা অনিয়মের মাধ্যমে সাড়ে ১৫ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আসবাব কেনাকাটা করা হয়েছে। ওই সব সরঞ্জামের কেনা দামের সঙ্গে বাজারদরের কোনো সামঞ্জস্য নেই। বাজারদরের কয়েক গুণ বেশি দাম দেওয়া হয়েছে প্রতিটি পণ্যে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. আজম খান এ–সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন সচিব বরাবরে জমা দিয়েছেন। কেনাকাটায় অনিয়ম নিয়ে ১ ডিসেম্বর প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এরপর স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের যুগ্ম সচিব (নির্মাণ ও মেরামত অধিশাখা) মো. আজম খানকে প্রধান করে এক সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়। মো. আজম খান ৫ ডিসেম্বর বিষয়টি তদন্ত করতে হবিগঞ্জে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ পরিদর্শনে যান। তিনি ওই দিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় নিয়ে তদন্ত করেন। তাঁর এ তদন্তের প্রতিবেদন ১৮ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সচিব বরাবর জমা দেন।

শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কম্পিউটার, আসবাব, মেডিকেল সরঞ্জাম কেনার জন্য ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দরপত্রের মাধ্যমে এ কাজ পায় ঢাকার নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ ও পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। কলেজ কর্তৃপক্ষ ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ১০৯ টাকায় ৫১৮ ধরনের মালামাল কেনে। ভ্যাটসহ মোট খরচ দেখানো হয় ১৫ কোটি ৪৯ লাখ ৭৮ হাজার ৮৫৭ টাকা। অভিযোগ ওঠে, ৪২ হাজার টাকার ল্যাপটপ কেনা হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার টাকায়। ৬০ হাজার টাকার কালার প্রিন্টারের দাম পড়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। ৩৯ হাজার টাকার রেফ্রিজারেটর ৮৫ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে। মানবদেহের মেডিকেল চার্ট—বাজারে যার দাম ৫০০ টাকা, তা কেনা হয়েছে ৭ হাজার টাকায়। এভাবে বেশি দামে ৫১৮ ধরনের জিনিস কেনা হয়। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের হবিগঞ্জ সমন্বিত কার্যালয়ও বিষয়টির অনুসন্ধান করছে।

মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির দেওয়া ছয় পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দরপত্র নীতিমালা অনুসরণ না করে নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে দরপত্র গ্রহণ ও কলেজের একাডেমিক জিনিসগুলো কেনা হয়েছে। কম্পিউটার, আসবাব ও যেসব মেডিকেল সরঞ্জাম কেনা হয়েছে, সেগুলোর কেনা দামের সঙ্গে বাজারদরের কোনো সামঞ্জস্য নেই। বাজারদরের কয়েক গুণ বেশি দাম ধরা হয়েছে প্রতিটি জিনিসে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বেশি দাম দেওয়ার পরও ওই সব সামগ্রীর গুণগত মানও ভালো নয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সরঞ্জাম কেনার বিষয়ে কলেজটির অধ্যক্ষ মো. আবু সুফিয়ান মালামাল নির্বাচন ও স্পেসিফিকেশন কমিটি, বাজারদর কমিটি, দরপত্র প্রস্তাব ও উন্মুক্তকরণ কমিটি এবং দরপত্র প্রস্তাব ও মূল্যায়ন কমিটিসহ যে চারটি কমিটি গঠন করেছেন, সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কমিটিতে যাঁদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, তাঁরা প্রত্যেকেই এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বা অবগত নন বলে তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন। এ ছাড়া কমিটিগুলোর কোনো সভা বা সমন্বয় ছাড়াই অধ্যক্ষ আবু সুফিয়ান একাই এ দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। তাঁকে এ কাজে সহায়তা করেছেন কলেজের প্রধান সহকারী ও হিসাবরক্ষক সিরাজুল আলম। পাশাপাশি দরপত্রের মাধ্যমে সরবরাহ আদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠান নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ ও পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের এ অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

তদন্ত কমিটির প্রধান যুগ্ম সচিব মো. আজম খান প্রথম আলোকে বলেন, দরপত্র নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তদন্তে তার সত্যতা পাওয়া গেছে। এ–সংক্রান্ত প্রতিবেদন ১৮ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সচিব বরাবর জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দরপত্রের দরের সঙ্গে পণ্যগুলোর বাজারদরের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবু সুফিয়ান ও অফিস সহকারী কাম হিসাবরক্ষক সিরাজুল আলমের নানা অনিয়মের বিষয় তদন্তে বের হয়ে এসেছে। তিনি বলেন, শুধু শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজই নয়, দেশের অনেক মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রে দেখা গেছে বরাদ্দগুলো দেওয়া হয় অর্থবছরের শেষ প্রান্তে। যে কারণে কলেজ কর্তৃপক্ষ অনেকটা তাড়াহুড়ো করে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। প্রতিবেদনে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবু সুফিয়ান প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবেদন বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি আরও বলেন, এ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেওয়ার পর সততা অবলম্বন করে তিনি কাজ করে আসছেন। সবকিছু তিনি সৃষ্টিকর্তার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।

শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি। হবিগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালের ২৫০ শয্যার নতুন ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় কলেজটির অস্থায়ী ক্যাম্পাস। বর্তমানে এর শিক্ষার্থী ১৫০ জন।