• ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২০
  • মৌলভীবাজার
  • 69
জনমানবহীন পরিত্যক্ত ‘জেলা প্রশাসক শিশুপার্ক’

নিউজ ডেস্কঃ একেবারে গভীর নিস্তব্ধতা! কেউ নেই সেখানে। মাঝে মধ্যে দু-চারটি পাখির ডাক নীরবতা ভাঙার চেষ্টা করে। ভেঙে যাওয়া কাচের টুকরো, বিবর্ণ দেয়াল কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়া নানান আসবাবপত্র জানান দেয় এ পরিত্যক্ত দালানের কথা।

দীঘদিন ধরে অব্যবহৃত এ সরকারি দালানটির নাম ‘জেলা প্রশাসন শিশুপার্ক’। মৌলভীবাজার শহরের পর্যটন রোড বনশ্রী এলাকার প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) সড়কের শেষ মাথায় সবার চেয়ে আলাদা নীরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে এটি। পার্কটি উদ্বোধনের পর সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে কয়েকজন কেয়ারটেকার বা নিরাপত্তাকর্মী থাকলেও, এখন আর কেউ নেই সেখানে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রায় আট বছর আগে ২০১২ সালের ১৭ নভেম্বর প্রাক্তন চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ ড. আব্দুস শহীদ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মৌলভীবাজার শহরের জেলা প্রশাসক শিশুপার্কটি। একসময় পর্যটন করপোরেশনের তত্ত্বাবধানের ছিল এ রেস্টহাউজটি। সেসময়ের জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমানের প্রচেষ্টায় পরিত্যক্ত এ ভবন ঘিরে শহরের শিশুদের জন্য পার্ক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

তারপর থেকে প্রাথমিকভাবে সেটি সংস্কার করে শিশুদের খেলাধুলা ও পর্যটক আকৃষ্ট করার জন্য বেশ কিছু রাইড কেনা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বেশ সাড়ম্বরে প্রথমবারের মতো পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বর্ষবরণ ও পিঠা উৎসবের আয়োজন করা হয়। নানা বয়সী মানুষের ঢল নামে সেখানে। একটি দিবস বা উৎসব ঘিরে সেটি দারুণ এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

সেই শুরু এবং শেষ! আর কোনো প্রকার উৎসব হয়নি সেখানে। এর কিছুদিন পর্যন্ত শহরের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ নানা বয়সীদের পদভারে মুখর থাকলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই দারুণভাবে ভাটা পড়ে এসব আয়োজনে। শহরের বিনোদনের এ পর্যটন কেন্দ্রটি শেষ পর্যন্ত মুখ থুবরে পড়ে রয়েছে।

সম্প্রতি মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক শিশু পার্কে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ভবনটি সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত ও জনমানবহীন। নেই একজন নিরাপত্তাকর্মী বা কেয়ারটেকারও। প্রধান ফটকটি তালাবিহীন, যে কেউ অনায়াসে প্রবেশ করতে পারেন ভেতরে। সেই পরিত্যক্ত দালানের কোঠাগুলো দরজা-জানালাবিহীন। সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা পাঁচটি বসার স্থান, শিশুদের জন্য দোলনা ও স্টিল দিয়ে তৈরি কয়েকটি বসার স্থান রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

দালানের ভেতর প্রবেশ করে এবং দোতলায় উঠে দেখা গেছে, বিশালাকৃতির কোঠায় নানা আসবাবপত্র ভাঙা। সাদা দেয়ালে ঘন কালচে-সবুজ হয়ে শ্যাওলা পড়েছে। দেয়ালে ও ছাদের কার্পেটের টেম্পার চলে যাওয়ায় দেয়াল থেকে খসে পড়ছে চুন-সিমেন্টের টুকরো টুকরো অংশ।

পার্শ্ববর্তী পিটিআই এর প্রশিক্ষণে আসা তিনজন হঠাৎ করে জেলা প্রশাসক শিশুপার্কের ভেতরে অনায়াসে প্রবেশ করেন। কথা বলে জানা যায়, তাদের নাম যথাক্রমে মো. ওয়ালী উল্লাহ, মো. আলমগীর এবং মিনহাজ উদ্দিন। তারা বলেন, আমরা এখানে ট্রেনিংয়ে এসেছি। জায়গাটা নির্জন বলে কিছু সময় কাটাতে এলাম। এত সুন্দর একটি ভবন এভাবে ফেলে রাখার কোনো মানে হয় না। সরকারি দেখাভালের অভাবে এভাবে পরিত্যক্ত থাকতে থাকতে এটি যে কোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার সম্ভাবনাও দেখা দেবে।

পাশের দালানের নির্মাণশ্রমিক সামাদ মিয়া ও সাগর আহমেদ বলেন, মাঝে মধ্যে এখানে তরুণরা আড্ডা দিতে আসে; কেউ কেউ আবার এখানে এসে বিভিন্ন কোঠা বা ছাঁদে উঠে মাদকসেবন করে। এছাড়া, তরুণ-তরুণীরা একত্রে এখানে সময় কাটাতে আসে। কোনো কোনো তরুণ-তরুণী এখানে ঘুরতে আসলে বিভিন্ন ফাঁদে ফেলে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়।

মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং দৈনিক কালের কণ্ঠের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আবদুল হামিদ মাহবুব বলেন, মৌলভীবাজারে শিশুদের কোনো পার্ক নেই। যেটি ছিল পৌরসভার সামনে, আমরা শিশুপার্ক বলতাম, সেই পার্কটি মেয়রচত্বরে রূপান্তর করে চটপটির দোকানসহ নানা বয়েসীদের দৈনিক আড্ডার স্থানে পরিণত করে ফেলা হয়েছে। ফলে শিশুদের বিকেলে ভ্রমণ, একটু খেলাধুলাসহ চিত্তবিনোদনের কোনো ব্যবস্থা আর আমাদের মৌলভীবাজারে নেই।

তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক শিশুপার্কটি যখন প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন শহরবাসী খুবই আশাবাদী হয়েছিল যে, এখন শিশুদের নিয়ে বিকেলে এখানে ঘুরে বেড়ানো যাবে। কিন্তু শিশুপার্কটি সুষ্ঠুভাবে দেখভালের অভাবে সেই পথটিও বন্ধ হয়ে গেছে। এটি পূর্ণাঙ্গ শিশুপার্কে রূপান্তর করা হলে আমাদের শিশুরা খুবই উপকৃত হবে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক (ডিসি) নাজিয়া শিরিন বলেন, শিশুদের কথা বিবেচনা করে জেলা প্রশাসক শিশুপার্কটিকে আমরা নতুন করে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি। আপনি হয়তো দেখে থাকবেন, ইতোমধ্যে জঙ্গল বা ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে গাছপালা লাগানো হয়েছে। শিগগিরই এটি নতুন রূপ নেবে।সুত্রঃ বাংলানিউজ২৪.কম