• এপ্রিল ২১, ২০২০
  • মতামত
  • 309
নিভৃত কর্মচারীদের আত্মকথন

মতামতঃ একটি দৈনিক পত্রিকায় দেখলাম সারা দেশে প্রায় সাড়ে চারশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহোদয়গণ করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কথাটি শতভাগ সত্য এবং এতে কোন বিতর্কের অবকাশ নেই। প্রতিটি উপজেলার ইউ.এন.ও অফিসের কার্যক্রম চলমান আছে। ইউ.এন.ও অফিস এবং এসি ল্যান্ড অফিসের অন্যান্য কর্মচারীগণ সার্বক্ষণিক কর্মস্থলে উপস্থিত থেকে অফিস প্রধানদের সাহায্য করে যাচ্ছেন। সেটা ত্রাণ বিতরণ হোক, মোবাইল কোর্টের পেশকার হিসেবে হোক অথবা জরুরি চিঠি এবং রিপোর্ট প্রেরণ সংক্রান্ত হোক, তারা প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। ঝুঁকি বিবেচনায় এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় উক্ত অফিসের কর্মচারীগণ কিন্তু পিছপা হোন নি। তারা ঠিকই তাদের মেধা, শ্রম দিয়ে ইউ.এন.ও এবং এসি ল্যান্ড মহোদয়গণকে প্রতিনিয়ত সাহায্য করে চলেছে।

একই অবস্থা জেলা প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু ডিসি অফিসের কর্মচারীদেরও। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় তারাও দিন রাত পরিশ্রম করে চলেছে। কখনো বা কন্ট্রোল রুমের ডিউটি, কখনো বা মোবাইল কোর্টের পেশকার, করোনা পরিস্থিতির আপডেট রিপোর্ট তৈরী, জরুরি চিঠি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ ইত্যাদি কাজের জন্য তাদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়েই ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে। দিন নেই রাত নেই কর্তৃপক্ষের ফোন পাওয়া মাত্রই কর্মস্থলে যাচ্ছে। সবজায়গায় লকডাউন চলছে। যাতায়াতের জন্য কোন যানবাহন না থাকা সত্ত্বেও তারা ঠিকই কর্মস্থলে পৌছে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মতো কাজ করে চলছে।

কিন্তু দু:খের বিষয় হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথাই বলি বা অন্য যেকোন সংবাদ মাধ্যমের কথাই বলি প্রশাসনের এই নিভৃত কর্মচারীগণ সবসময়ই পাদ প্রদীপের আলো থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের কাজের পরিধির ব্যাপকতা, দক্ষতা, পরিশ্রম এবং কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য ইত্যাদি কারনে আজ পর্যন্ত কোন জায়গা হতে স্বীকৃতি মেলেনি। তাদের যারা অভিভাবক সেই জায়গা হতেও প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন। যেখানে অন্য সব মন্ত্রণালয় কর্মচারী বান্ধব কিন্তু কেন জানি তাদের বেলায় কবি নীরব!!!

একটা ব্যাপার লক্ষণীয় যে, এতো সব বৈষম্য বঞ্চনা সত্ত্বেও বিভাগীয় কমিশনার অফিস, ডিসি অফিস, ইউ.এন.ও অফিস এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীরা দিবারাত্রি কাজ করে চলেছে। নেই তাদের কাজের স্বীকৃতি, নেই তাদের পদোন্নতি কিন্তু তার পরেও কর্তৃপক্ষের নির্দেশ কখনোও অমান্য করেনি। যখন যেরূপ কাজের জন্য বলা হচ্ছে সেরূপ কাজ তারা করে দিচ্ছে। যেকোন দিবস উদযাপন, র‌্যালি অথবা মিটিং আয়োজন, রেজুলেশন প্রস্তুত, শত শত রিপোর্ট রিটার্ন, শত শত মামলার জবাব প্রেরণ, জলমহাল ব্যবস্থাপনা, মোবাইল কোর্টে সহায়তা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, ই-নথি কার্যক্রম, অনলাইনে পর্চা প্রদান, গুরুত্বপূর্ণ চিঠি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ ইত্যাদি বহুমুখী কাজ এই মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীদের দ্বারাই হয়ে থাকে। কেন্দ্র এবং মাঠ প্রশাসনের যে সেতু বন্ধন সেটার আনসাং হিরো কিন্তু এই মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীরাই। অন্যান্য অফিসের কর্মঘন্টা যেখানে সকাল ৯ হতে ৫ টা সেখানে তাদের কর্মঘন্টা সকাল ৯ টা হতে রাত ৮/৯ টা পর্যন্ত। জেলা অথবা উপজেলায় সন্ধ্যার পর যখন সকল অফিসে তালা ঝুলে তখনও কিন্তু ডিসি অফিস অথবা ইউ.এন.ও অফিসের বাতি জ্বলে।

বর্তমান করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলার কথাই যদি ধরি তাহলেও দেখা যায়, দেশের প্রতিটি বিভাগীয় কমিশনার অফিস, ডিসি অফিস, ইউ.এন.ও অফিস এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সর্বদা কাজ করে চলেছে। পত্রিকায় যখন প্রকাশিত হয় ওমুক উপজেলার ইউ.এন.ও অথবা এসি ল্যান্ড মহোদয় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন, হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে জনগণকে বোঝানো অথবা জরিমানা করছেন, ত্রাণ বিতরণের জন্য তালিকা প্রস্তুতসহ বিভিন্ন কাজ করছেন এ সকল কাজে কিন্তু ঠিকই উনাদের অফিসের অধস্তন কর্মচারীরা সাথে থাকছেন। যেখানে অফিস প্রধান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন সেখানে তাদের বসে থাকার কোন প্রশ্নই উঠে না। তারা ঠিকই সাধ্যমত সর্বক্ষেত্রে তাদের অফিস প্রধানকে সাহায্য সহযোগিতা করে যাচ্ছে। তবে কেন যেন তাদের এই ঝুঁকি পূর্ণ কাজের খবর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয় না।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশের এই দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে তারা ঠিকই কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও কাজ করে যাবে। অতীতেও যে কোন দুর্যোগকালীন মুহুর্তে মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীরা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছে এবং এটা প্রমাণিত। মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীরা কাজের ক্ষেত্রে কোনদিন পিছপা হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না। কোন প্রণোদনা, কোনো স্বীকৃতির আশা ব্যতিরেকেই কাজ করে যাচ্ছে ও যাবে। যেখানে তারা যৌক্তিক অধিকার হতেই বঞ্চিত হচ্ছে সেখানে এরূপ প্রণোদনা আশা করা বিলাসিতা। তারপরও তারা আশায় থাকে। হয়তো একদিন তাদের দু:খ কর্তৃপক্ষ বোঝবে। সৃষ্টিকর্তার আর্শীবাদে এবং বিজ্ঞানীদের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে কিছুদিন পর হয়তো করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বড় কর্তারা ঠিকই নানা রকম প্রণোদনা হয়তো পেয়ে যাবেন। কিন্তু মাঠ প্রশাসনের এই নিভৃত কর্মচারীদের বেলায়? তাদের ভাগ্যে কি কিছু জুটবে? তাদের যৌক্তিক দাবীগুলো কি বাস্তবায়িত হবে? ঐ যে বললাম!! এখানে কবি নীরব…

লেখক অমিত চন্দ
অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সুনামগঞ্জ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *