• এপ্রিল ৫, ২০২২
  • শীর্ষ খবর
  • 233
হাওরের ফসল রক্ষায় নির্ঘুম রাত জগন্নাথপুরের কৃষকদের

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ আকাশ মেঘলা, বৃষ্টি হতে পারে যেকোনো সময়। নদ–নদীতে পানির চাপ বাড়ায় ফসল রক্ষার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিতে। এমন অবস্থায় হাওরে আধা পাকা ধান রেখে ঘুমানোর উপায় নেই। তাই ফসল রক্ষার জন্য সারা রাত এক বাঁধ থেকে আরেক বাঁধে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে কাটিয়েছেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ভূরাখালী গ্রামের কৃষক সুজন মিয়া। শুধু সুজন মিয়া নন, উপজেলার কয়েক শ কৃষক বোরো ধান রক্ষায় হাওরের বাঁধ ঠিক রাখতে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। এ কারণে এখন পর্যন্ত উজানের পানিতে তলিয়ে যায়নি কৃষকের সারা বছরের স্বপ্ন।

কৃষক সুজন মিয়া বলেন, একমাত্র বোরো ফসল তাঁর সাত সদস্যের পরিবারের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম। ৩০ কেদার (৩০ শতাংশে ১ কেদার) জমিতে ধারদেনা করে এবার বোরো আবাদ করেছেন তিনি। ধান তুলতে পারলে ধারদেনা শোধ করে সারা বছর নিশ্চিন্তে চলতে পারবেন। ফসল তুলতে না পারলে পথে বসা ছাড়া উপায় নেই।

জেলার অন্যতম বৃহৎ হাওর নলুয়াবেষ্টিত চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বলেন, ফসল রক্ষায় শতাধিক কৃষক সারা রাত স্বেচ্ছায় নলুয়ার হাওরে কাজ করেছেন। ফসল রক্ষায় নির্মিত বেড়িবাঁধগুলো টেকসই ও মানসম্মত না হওয়ায় কৃষকদের নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে। শহিদুল ইসলামের দাবি, বেড়িবাঁধ উপচে পানি ঢোকার মতো বিপর্যয় আসেনি। নদ–নদীতে পানি বাড়ার চাপে বাঁধ ভেঙে ফসলডুবির শঙ্কা আছে।

আজ মঙ্গলবার সকালে নলুয়ার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, কিছু কিছু জমিতে আধা পাকা ধান কাটছেন কৃষক। কেউ কেউ বেড়িবাঁধ ঘুরে দেখছেন। এক জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ অংশে মাটি ফেলার কাজ চলছিল।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল সোমবার রাতে নলুয়ার হাওরের ভূরাখালী এলাকার অবস্থিত ৫ ও ৬ নম্বর প্রকল্পে ভূরাখালী গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেছেন। এ ছাড়া ১৬ ও ১৭ নম্বর প্রকল্পের কিছু অংশ ধসে যাওয়ার পর বিকল্প বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। সে বাঁধ দুটি টেকসই করতে চিলাউড়া গ্রামের কৃষকেরা সারা রাত স্বেচ্ছায় কাজ করেন। এ ছাড়া নলুয়ার হাওরের ভেটুখালী বেড়িবাঁধ রক্ষায় কাদিপুর গ্রামের কৃষকেরা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেন।

ভূরাখালী সমাজসেবা সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান জানান, তাঁদের সংগঠনের ৩০ সদস্য গ্রামবাসীর সঙ্গে স্বেচ্ছাশ্রমে বেড়িবাঁধে মাটি ফেলার কাজ করেন সারা রাত। পানির চাপে বেড়িবাঁধগুলো ঝুঁকিতে ছিল। স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করায় বাঁধ রক্ষা হয়েছে।

পাটলী ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম জানান, পাটলী ইউনিয়নের কইলার হাওর, আধাকান্দি হাওর, বিলচর হাওর, ঘাইটার হাওর, সাতবনদের হাওরে কৃষকেরা সারা রাত স্বেচ্ছায় কাজ করে ফসল রক্ষার চেষ্টা করেছেন। তাঁর অভিযোগ অপ্রয়োজনীয় অনেক বেড়িবাঁধ হলেও পাটলী ইউপির ফসল রক্ষায় কোনো বেড়িবাঁধ হয়নি।

রানীগঞ্জ ইউপির চেয়ারম্যান ছদরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছি। এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। আর পানি বাড়লে বিপদ হতে পারে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী হাসান গাজী প্রথম আলোকে বলেন, জগন্নাথপুর উপজেলায় এবার সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৮টি প্রকল্পে ফসলরক্ষা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি বেড়িবাঁধ অতিরিক্ত পানির চাপে ঝুঁকিতে আছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সঙ্গে এলাকার লোকজন স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে বাঁধ রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষকদের সঙ্গে আমিও সারা রাত হাওরে ছিলাম। আশা করছি আর পানি না বাড়লে ফসল উত্তোলন করা যাবে। বেড়িবাঁধ রক্ষায় সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’