• সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৩
  • শীর্ষ খবর
  • 185
হাসপাতালে কাকে রেখে কার খোঁজ নেবেন, বুঝতে পারছেন না জোছনা

নিউজ ডেস্কঃ সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চতুর্থ তলায় সার্জারি বিভাগের ৪ নম্বর ওয়ার্ড। ওয়ার্ডের একটি শয্যায় আগুনে দগ্ধ তারেক উদ্দিন (৩০) নামের এক যুবক চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাঁর মুখ, বুক, হাত ও পা দগ্ধ হয়েছে।

বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ওই ওয়ার্ডের একটি শয্যার পাশে বসে ছিলেন দুই নারী। শাহেদা বেগম (৫০) ও জোছনা বেগম (৪৯)। তাঁরা পরস্পরের বেয়ান। তাঁদের মধ্যে শাহেদা বেগম তারেকের মা এবং জোছনা বেগম তারেকের শাশুড়ি। তারেক উদ্দিন সিলেটর সদর উপজেলার জাঙ্গাইল এলাকার বাসিন্দা।

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিলেটের মিরাবাজার এলাকার বিরতি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে আগুন লেগে দগ্ধ হওয়া নয়জনের মধ্যে একজন তারেক উদ্দিন। দগ্ধ হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তারেকের শ্যালক ইমন আলীও (২০) রয়েছেন। তাঁর শরীরের ৪০ শতাংশের বেশি পুড়ে গেছে।

জোছনা বেগম বলেন, তাঁদের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায়। তাঁর দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। বড় ছেলে বিয়ের পর আলাদা হয়ে গেছেন। স্বামী বয়স হয়ে যাওয়ায় এখন আর কাজ করতে পারেন না। এখন ছোট ছেলে ইমনই সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী। বছরখানেক হয় ইমন আলীকে কাজে নিয়েছেন তাঁর দুলাভাই তারেক উদ্দিন। এখন ছেলে এবং মেয়ের জামাই দুজনই আগুনে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে। ছেলের অবস্থা মেয়ের জামাইয়ের তুলনায় খারাপ। ছেলেকে হাসপাতালের পঞ্চম তলায় একটি কক্ষে রাখা হয়েছে (পোস্ট অপারেটিভ)। মেয়ের জামাই চতুর্থ তলায়। কিছুক্ষণ পরপর চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় আসা-যাওয়া করেন তিনি।

জোছনা বেগম বলেন, এখন মেয়ে আর নিজের সংসার নিয়ে চিন্তিত তিনি। আহত দুজনই দুই পরিবারের উপার্জনকারী। তাঁদের এমন অবস্থায় সংসার কীভাবে চলবে, বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন তিনি।

তারেক উদ্দিনের মা শাহেদা বেগম বলেন, তাঁদের তিন বছরের এক নাতি রয়েছে। তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সবার বড় তারেক উদ্দিন। তাঁর স্বামী বাড়ির পাশে একটি ছোট মুদিদোকান চালান। তাঁদের দুজনের টাকায় সংসার চলে। এখন ছেলের চিকিৎসা, সংসারের খরচ নিয়ে চিন্তা করতে গেলে সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।

হাসপাতালের চতুর্থ তলায় ফিলিং স্টেশনে আগুনে দগ্ধ হওয়া পাঁচজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সবার মুখ, হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় দগ্ধ হয়েছে। সবার মুখ পুড়ে গিয়ে কালো হয়ে রয়েছে।

পঞ্চম তলায় পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে চিকিৎসাধীন রোমান আলী (২৩)। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে হাতপাখায় বাতাস করছিলেন মা রাজনা বেগম (৪৫)। তিনি বলেন, তাঁর এক ছেলে ও চার মেয়ে। ছেলে রোমান আলী সবার বড়। তাঁর আয়েই চলে সংসার। ছেলে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে থাকায় তিনি চোখে শুধু অন্ধকার দেখছেন। রোমান মঙ্গলবার রাতে কিছুটা কথা বললেও বুধবার সকাল থেকে ঘুমাচ্ছে। কথা বলছে না। তবে কিছু সময় পর কাতরাচ্ছে।

সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে থাকা চারজনের শরীরের ৪০ শতাংশের বেশি পুড়ে গেছে। আর সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন পাঁচজনের মধ্যে একজনের ২৪ শতাংশের মতো পুড়ে গেছে। বাকি চারজন ৩০ শতাংশের ওপর পুড়ে গেছে। নয়জনকেই পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট পুরোদমে চালু হয়নি। তাঁদের শ্বাসনালি পুড়ে গেছে কি না, এখনই বোঝা যাচ্ছে না। হাসপাতালের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে।

সহায়তা দিয়েছে জেলা প্রশাসন

সিএনজি ফিলিং স্টেশনে আগুনের ঘটনায় দগ্ধ হওয়া ৯ জনকে সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ইমরুল হাসান আগুনে দগ্ধ ব্যক্তিদের দেখতে হাসপাতালে গিয়ে স্বজনদের হাতে চিকিৎসাসহায়তা হিসেবে এ ১০ হাজার টাকা দেন।

ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে

মিরাবাজার এলাকার বিরতি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে কমপ্রেসর কক্ষে হঠাৎ বিকট শব্দ হয়। এ সময় কমপ্রেসর মেশিনসহ আশপাশের যন্ত্রপাতিতে আগুন ধরে যায়। এতে পাম্পে থাকা নয়জন মুহূর্তে অগ্নিদগ্ধ হন। খবর পেয়ে সিলেট ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

আহত ব্যক্তিরা হলেন নজরুল ইসলাম (৪৫), বাদল চন্দ্র দাস (৪০), রিপন চন্দ্র দাস (৩২), উৎপল চন্দ্র দাস (৪০), তারেক উদ্দিন (৩০), ইমন আলী (২০), মিনহাজ উদ্দিন (৩২), রোমান আহমদ (২৩) ও রুমেল সিদ্দিক (২৮)।