- অক্টোবর ১০, ২০২৬
- জাতীয়
- 1
নিউজ ডেস্কঃ “শিশিরে শিশিরে শারদ আকাশে ভোরের আগমনী, শিউলি ঝরানো দিন আনে সে, চিরদিনের বাণী, ভোরের আগমনী।” আজ ১০ অক্টোবর শনিবার শারদীয় দুর্গোৎসবের পুণ্যলগ্ন শুভ মহালয়া। পিতৃপক্ষের শেষে দেবীপক্ষের শুরু। দেবী দুর্গা আজ পা রেখেছেন মর্ত্যলোকে। চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আবাহনই মহালয়া।
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এ হচ্ছে দুর্গা দেবীর আগমনী বার্তা। বছর ঘুরে আবারও দেবী দুর্গা আসছেন তাঁর বাবার বাড়ি।
হিমালয়ের কৈলাশে স্বামী শিবের বাস। সেখান থেকেই সুদূর পথ পাড়ি দিয়ে আসেন মর্ত্যলোকে। সঙ্গে নিয়ে আসেন পুত্র গণেশ ও কার্ত্তিক এবং কন্যা লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে। প্রতিবছর শরৎকালে দেবী দুর্গার এই আগমন হয় তার নিজ ভূমিতে।
হিন্দু শাস্ত্রমতে, দেবী দুর্গার আবাহনই মহালয়া হিসেবে পরিচিত। মহালয়া দুর্গোৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদিন গঙ্গাতীরে প্রার্থনা করে ভক্তরা প্রয়াত আত্মীয়-স্বজন ও পূর্বপুরুষদের আত্মার মঙ্গল কামনা করেন।
রাজা সুরথ সর্বপ্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। বসন্তকালে তিনি এই পূজার আয়োজন করায় দেবীর এ পূজাকে বাসন্তী পূজাও বলা হয়। মর্যাদা পুরোষোত্তম ভগবান শ্রীরামচন্দ্র রাবণের হাত থেকে সীতাকে উদ্ধার করতে যাওয়ার আগে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। তাই শরৎকালের এই পূজাকে হিন্দুমতে অকালবোধনও বলা হয়। এই দিনে দেব-দেবীকুল দুর্গাপূজার জন্য নিজেদের জাগ্রত করেন।
আজ ভোরে মন্দিরে মন্দিরে শঙ্খের ধ্বনি ও চণ্ডিপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীদুর্গার আবাহন হবে। মহালয়ার সময় ঘোর অমাবস্যা থাকে। মহাতেজের আলোয় সেই অমাবস্যা দূর হয়। প্রতিষ্ঠা পায় শুভশক্তি। এভাবেই মর্ত্যলোকে আগমন ঘটে দেবী দুর্গার। মন্দিরে মন্দিরে উচ্চারিত হয় ‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেন সংস্থিতা, নমস্ত্যসৈ নমস্ত্যসৈ নমস্ত্যসৈ নমো নমঃ’। ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও মূলত আজ থেকেই পূজারীরা দুর্গা মায়ের আগমনী ধ্বনি শুনতে পান।
আজ পবিত্র মহালয়া উপলক্ষে ‘মহালয়া উদ্যাপন পরিষদ শ্রীহট্ট’-এর আয়োজনে ব্যাপক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। সিলেট নগরের মিরাবাজারস্থ শ্রীশ্রী বলরাম জিউর আখড়ায় ৩ দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠান হবে। গত ৮ অক্টোবর থেকে ৩ দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠান শুরু হয়। এই বছর মহালয়া উদ্যাপন পরিষদ শ্রীহট্টের ৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান হচ্ছে।
আজ ১০ অক্টোবর শনিবার সকাল সাড়ে ৮ টায় মহালয়া উদযাপন পরিষদ শ্রীহট্টের সহ-সম্পাদক বিশ^জিৎ চক্রবর্ত্তী সুমনের পরিচালনায় শ্রীশ্রী চণ্ডী মায়ের পূজা ও শ্রীমা সারদা সংঘ সিলেটের সম্পাদিকা বর্ণালী পুরকায়স্থের পরিচালনায় সমবেত চণ্ডীপাঠ।
সকাল ১০টায় নৃত্য প্রতিযোগিতা উপকমিটির আহবায়ক মৃনাল কান্তি চৌধুরী মঞ্জুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সিলেটের সহকারী ভারতীয় হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাস। শ্রীমা সারদা সংঘ সিলেটের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হেপী দেব শিল্পীর পরিচালনায় ও প্রশিক্ষণার্থী শিশু-কিশোরবৃন্দের পরিবেশনায় দুপুর ২ টায় ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
মহালয়া উদযাপন পরিষদ শ্রীহট্ট ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের সভাপতি এ্যাপেক্সিয়ান জি.ডি. রুমুর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক দ্বীপক কুমার দাশ এর সঞ্চালনায় সন্ধ্যা ৬টায় ধর্মসভা, পুরস্কার বিতরণী ও ‘অরুণ আলোর অঞ্জলি’ মোড়ক উন্মোচন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এমপি। সম্মানিত অতিথি ও মূখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সিলেট রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের সম্পাদক শ্রীমৎ স্বামী চন্দ্রনাথানন্দজী মহারাজ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সিলেটের বিশিষ্ট সমাজসেবী জ্যোতির্ময় সিংহ মজুমদার চন্দন, সিলেট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট অশোক পুরকায়স্থ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট জেলা শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোপিকা শ্যাম পুরকায়স্থ চয়ন, সহ সভাপতি অধ্যাপক রজত কান্তি ভট্টাচার্য্য, সাধারণ সম্পাদক এ্যাপেক্সিয়ান চন্দন দাশ, পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক অব. উপাধ্যক্ষ কৃষ্ণপদ সূত্রধর প্রমুখ।
রাত ৮টায় দরিদ্র অসহায়দের মধ্যে বস্ত্রদান উপকমিটির আহবায়ক হারাধন দেব প্রভাষের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি মোঃ নাসিম হোসাইন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সিলেট মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার দেব, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র আইনজীবী প্রশান্ত কুমার পাল, শ্রীশ্রী ঁবলরাম জিউর আখড়া পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তপন চৌধুরী টুটুল প্রমুখ।
‘মহালয়া উদ্যাপন পরিষদ শ্রীহট্ট’-এর সভাপতি সিলেটের বিশিষ্ট ইমিগ্রেশন অ্যাডভাইজার জি.ডি. রুমু ও সাধারণ সম্পাদক ন্যাশনাল ব্যাংক ম্যানেজার দ্বীপক কুমার দাশ সকল পুণার্থীদেরকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে সফল ও স্বার্থক করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ সিলেট জেলা ও মহানগর শাখা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার বার্ষিক প্রতিনিধি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে ১৮টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার যৌথ উদ্যোগে ১১ সদস্যের একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। পূজা কমিটিগুলোকে সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিং সেলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ বছর সিলেট মহানগর এলাকায় সার্বজনীন ১৪৬টি ও পারিবারিক আয়োজনে ১৬টি পূজো অনুষ্ঠিত হবে। সব মিলিয়ে সিলেট মহানগর এলাকায় সর্বমোট ১৬২টি মণ্ডপে পূজো অনুষ্ঠিত হবে। সিলেট জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সার্বজনীন পূজো হবে ৪৭৪টি এবং পারিবারিক পূজো হবে ২৬টি। সিলেট জেলার সার্বজনীন ও পারিবারিক মিলিয়ে সর্বমোট ৫০০টি পূজো হবে। সিলেট জেলা এবং সিলেট মহানগর মিলিয়ে সর্বমোট ৬৬২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজিত হবে।
সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন ৫৮টি ও পারিবারিক ৫টি, বালাগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন ৩০টি ও পারিবারিক ৩টি, কানাইঘাট উপজেলায় সার্বজনীন ৩৫টি, জৈন্তাপুর উপজেলায় সার্বজনীন ২০টি, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন ৪০টি ও পারিবারিক ১টি, বিশ্বনাথ উপজেলায় সার্বজনীন ২৩টি ও পারিবারিক ৩টি, গোয়াইনঘাট উপজেলায় সার্বজনীন ৪০টি, জকিগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন ৯৩টি ও পারিবারিক ২টি, বিয়ানীবাজার উপজেলায় সার্বজনীন পূজা ৪২টি ও পারিবারিক ১২টি, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন ২৮টি এবং ওসমানীনগর উপজেলায় সার্বজনীন পূজা ৩৯টি। সিলেট মহানগরের কোতোয়ালী মডেল থানা এলাকায় সার্বজনীন পূজো হবে ৩১টি ও পারিবারিক ১১টি, জালালাবাদ থানায় সার্বজনীন ১৯টি ও পারিবারিক ২টি, এয়ারপোর্ট থানা এলাকায় সার্বজনীন ৩৯টি ও পারিবারিক ১টি, শাহপরাণ (র.) থানা এলাকায় সার্বজনীন ২৫টি ও পারিবারিক ১টি, দক্ষিণ সুরমায় সার্বজনীন ১৫টি ও এবং মোগলাবাজারে সার্বজনীন ১৭টি ও পারিবারিক ১টি পূজো অনুষ্ঠিত হবে।
এই বছর দুই দিন মহাসপ্তমীর পূজা অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ১৬ অক্টোবর শুক্রবার মহাষষ্ঠী। পরদিন ১৭ অক্টোবর শনিবার মহাসপ্তমী। ১৮ অক্টোবর রবিবার মহাসপ্তমী। ১৯ অক্টোবর সোমবার মহাঅষ্টমী। ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমী।
এবার দেবী শ্রীশ্রী দুর্গা মাতার আগমন ঘটবে ঘোটকে ও গমন হবে নৌকায়। এদিকে, আগামী ২৫ অক্টোবর রবিবার শ্রীশ্রী কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা ও ৮ নভেম্বর রবিবার শ্রীশ্রী শ্যামাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
