• এপ্রিল ১৩, ২০২৬
  • লিড নিউস
  • 3
সিলেটের শারপিন টিলায় স্থাপন হচ্ছে পুলিশ ক্যাম্প

নিউজ ডেস্কঃ ছবি দেখলে যে কেউ আঁতকে উঠবে। কঙ্কালসার একটি টিলা। নথি বলছে, টিলার উচ্চতা ৬৫ ফুট। কিন্তু বাস্তবে টিলার কোনো অস্তিত্ব নেই। টিলা বিলীন হয়নি। সেটিকে গিলে খেয়ে ফেলা হয়েছে। প্রশাসনের হিসাব মতে ৪৭ জনের একটি পাথরখেকো সিন্ডিকেট টিলাকে সাবাড় করে দিয়েছে। লুট করেছে হাজার কোটি টাকার পাথর।
এখন কেবল নামেই শারপিন টিলা। বড় বড় গর্তে পরিণত হয়েছে গোটা এলাকা। ছিল শাহ আরেফিন নামের এক ওলির আস্তানাও। লাল পতাকা উড়েছিল সেখানে। একটি গাছের নিচে ছিল আসনের অস্তিত্ব। সেটিও আর নেই। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই টিলার পাথর লুটে খাদকরা ছোবল বসায়। তখনই শেষ করে দেয়া হয় বেশির ভাগ পাথর। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এসে শেষ পেরেক বসানো হয় টিলায়। নানা ঘটনা ঘটে পাথর লুটকে কেন্দ্র করে। এক সময় সরাসরি ওই টিলার লুট করা পাথর থেকে চাঁদাবাজি শুরু করেছিল পুলিশ। অভিযোগ ওঠার পর একদিনেই ১৩ পুলিশ সদস্যকে কোম্পানীগঞ্জ থেকে বদলি করা হয়। রাজনৈতিক নেতাদের নামেও একাধিক মামলা করা হয়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শারপিন টিলার পাথর লুটে রয়েছে সর্বদলীয় সিন্ডিকেট।

টিলার পাথর লুটে নেতৃত্ব দিতো আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতারা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেতৃত্বে আসে জামায়াত ও বিএনপি’র কয়েকজন নেতা। তবে ওই নেতাদের নাম ব্যবহার করে মূলত আওয়ামী লীগের নেতাদের শেল্টারেই লুট হয় পাথর। বেশি লুট হয় নির্বাচনকালীন সময়ে। প্রশাসন আইনশৃঙ্খলায় নজর দেয়ায় পাথরখেকোরা নীরবেই লুটে খায় ওই টিলার পাথর। সম্প্রতি লুটের চেষ্টা করলে হৈচৈ শুরু হয়। এ নিয়ে প্রশাসনও হয় সক্রিয়।

বিষয়টি নজরে যায় এলাকার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর। তিনি শারপিন টিলার পাথর লুট বন্ধে সোচ্চার হয়েছেন। মন্ত্রীর কঠোর জবাব- একটি পাথরও কেউ সরিয়ে নিতে পারবে না। এজন্য তিনি প্রশাসনকে যত কঠোর হওয়া প্রয়োজন তত কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন। মন্ত্রীর নির্দেশে এখন কোম্পানীগঞ্জের শারপিন টিলায় সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল বিকালে শারপিন টিলার পার্শ্ববর্তী ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর এলাকা পরিদর্শনে যান শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এ সময় তার সঙ্গে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার ছিলেন। মন্ত্রী শারপিন টিলা এলাকায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। তার এই নির্দেশনার প্রেক্ষিতে জেলার পুলিশ কর্মকর্তারা কাজ শুরু করবেন বলে জানিয়েছে পুলিশের সূত্র।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন- শারপিন টিলার পাথর লুট বন্ধে এখন পুলিশের তরফ থেকে ২৪ ঘণ্টাই টহল দেয়া হচ্ছে। গেল কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি মামলার পাশাপাশি আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

কারা লুট করেছে টিলা: শারপিন টিলায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় লুটের ঘটনায় সিলেটের তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা হাকিম (এডিএম) আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহেদুল ইসলাম একটি তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করেছিলেন। ২০১৭ সালে দাখিল করা ওই রিপোর্টে অবৈধভাবে পাথর তোলায় ৪৭ জন জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। স্থানীয় পুলিশ, প্রশাসন ও গণমাধ্যম কর্মীরাও এতে ‘পরোক্ষভাবে’ জড়িত থাকার প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি। ওই বছরের ২৩শে জানুয়ারি শারপিন টিলা ধসে পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার পরপরই জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত দল গঠন করে। তদন্ত প্রতিবেদনে শারপিন টিলা কেটে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনে স্থানীয় ৪৭ জন প্রভাবশালীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরা হচ্ছেন কোম্পানীগঞ্জের চিকাডহর গ্রামের আইয়ুব আলী, আঞ্জু মিয়া, সেরাব আলী, কুদ্দুস মিয়া, ফয়জুর রহমান, গরিব উল্লাহ, আতিউর রহমান, মুহিবুর রহমান, আবদুল করিম, নূর উদ্দীন, হেলাল উদ্দীন, শাহ আরেফিন টিলা জালিয়ারপাড় গ্রামের শুক্কুর আলী, বশর মিয়া, ফারুক মিয়া, মাসুক মিয়া, সোনা মিয়া, সাদ্দাম মিয়া, আশিক মিয়া, মো. মানিক মিয়া, সাজ্জাদ মিয়া, নূর মিয়া, বকুল মিয়া, রমজান মিয়া, হরমত উল্লাহ, নাসির মিয়া, আবদুল খালিক, আবদুল কাদির ও ইসমাইল আলী; পাড়ুয়া নোয়াগাঁও গ্রামের আতাউর রহমান; নারাইনপুর গ্রামের আবদুল হান্নান, আবদুর রহমান, আনাই মিয়া, আনফর আলী; পুরান জালিয়ারপাড় গ্রামের সমশের আলী কালা, আশিকুর রহমান, সমাদ মিয়া, লায়েক মিয়া, আবদুল খালিক, নূর ইসলাম; পূর্ব নারায়ণপুর গ্রামের রহিম; ভোলাগঞ্জ গ্রামের সোহেল মিয়া, শাহাব উদ্দীন; নতুন জালিয়ারপাড় গ্রামের ছায়ফুল ইসলাম; বাহাদুরপুর গ্রামের লীলু মিয়া এবং পাড়ুয়া লামাপাড়া গ্রামের একবার মিয়া, এনাম হোসেন ও ইসনাত আলী। পুলিশ জানিয়েছে- তালিকা থাকা সবার বিরুদ্ধে পাথর লুটের ঘটনায় বিভিন্ন সময় মামলা হয়েছে। তালিকা থাকা অনেকেই এখনো কয়েকটি মামলার আসামি রয়েছেন। প্রায় তিন বছর আগে এই টিলার আড়াইশ’ কোটি টাকার পাথর লুটের ঘটনা এক খাদকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালিয়ে সত্যতা পায় দুদক। এ মামলা আদালতে চলমান রয়েছে।

সুত্র : মানবজমিন