- নভেম্বর ৬, ২০২৬
- লিড নিউস
- 1
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর গ্রেপ্তারের আতঙ্কে গ্রামের পুরুষেরা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছেন। বাড়িতে রয়ে গেছেন নারী ও শিশুরা। আর পুরুষশূন্য এসব বাড়িতেই টানা তিন দিন ধরে প্রায় ৪০টি বাড়িতে লুটপাট চালানোর অভিযোগ উঠেছে প্রতিপক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে।
অভিযুক্তদের দাবি, ধান-চাল, গরু-ছাগল, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা, কৃষি যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র থেকে শুরু করে রান্নার হাঁড়ি-পাতিল পর্যন্ত লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এমনকি পানি পান করার গ্লাসও নেই কোনো কোনো বাড়িতে।
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নিজগাঁও গ্রামের প্রায় ৪০টি পরিবার এখন নিঃস্ব হওয়ার দাবি করছে। তাদের অভিযোগ, লুট হওয়া সম্পদের পরিমাণ অর্ধকোটি টাকার বেশি।
গত ৩১ অক্টোবর উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নের নিজগাঁও গ্রামে পতিত জমির দখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে আব্দুল মান্নান নামে একজন নিহত হন। এরপর পুলিশের গ্রেপ্তারের ভয়ে আজব আলীর পক্ষের লোকজন গ্রাম ছেড়ে চলে যান। এ সুযোগে তাদের বাড়িঘরে লুটপাটের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিজগাঁও গ্রামের পূর্ব পাশে থাকা একটি পতিত জমির দখল নিয়ে রূপ মিয়া ও আজব আলীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এর জের ধরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে রূপ মিয়ার চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান নিহত হন। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের ৩০ থেকে ৪০ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন রূপ মিয়া। সংঘর্ষের পর আজব আলীর পক্ষের লোকজন বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেলে একের পর এক বাড়িতে লুটপাট শুরু হয়।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, টানা তিন দিন রাতের আঁধারে প্রায় ৪০টি বাড়িতে লুটপাট করা হয়েছে। এসব বাড়ি থেকে ৬৫টি গরু, পাঁচটি পাওয়ার টিলার, দুটি মোটরসাইকেল, পানির পাঁচটি মোটর, ডিজেলচালিত ২০টি ইঞ্জিন, দুটি ধান মাড়াইকল, শতাধিক বস্তা বোরো বীজধান, প্রায় ৪০০ মণ বোরো ধান, ২০ মণ চাল, দুটি ফ্রিজ, ১২টি গ্যাসের চুলা ও সিলিন্ডার, পাঁচ লাখ টাকা এবং তিন ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নৌকা, আসবাবপত্র, গৃহস্থালি সামগ্রী ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্রও লুট হয়েছে বলে দাবি তাদের।
পুরুষ সদস্যরা বাড়িতে না থাকায় নারীরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, রাতে বাড়িতে এসে দরজা খুলতে চাপ দেওয়া হয়েছে, গালিগালাজ ও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। অনেক পরিবার ঘরের দরজা বন্ধ করে ভয়ে রাত কাটিয়েছে। পরদিন সকালে দেখতে পেয়েছেন, ঘরে থাকা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর নেই।
গ্রামের বাসিন্দা মৃত উমর আলীর স্ত্রী মিনারা বেগম বলেন, রাতে এসে ঘরের দরজা খোলার জন্য অনেক লাথি মেরেছে। ঘরের বেড়াতেও আঘাত করেছে এবং গালিগালাজ করেছে। ভয়ে তারা দরজা খোলেননি। পরে বাড়ির বাইরে রাখা তার দুই ছেলের দুটি মেশিন, চারটি গরু ও একটি নৌকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মাসুম মিয়ার স্ত্রী মোছা. আসমিনা বেগম বলেন, বাড়ির প্রায় সবকিছুই লুট করে নিয়ে গেছে। ৪০০ মণ ধান, ২০ মণ চাল, তিন ভরি স্বর্ণ, ১৭টি গরু, নগদ পাঁচ লাখ টাকা, ফ্রিজ, পানির মোটর, মোটরসাইকেল, ট্রলি ও ধান ভাঙানোর মেশিনসহ ঘরে থাকা প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘তিন দিনের লুটপাটে আমরা এখন পথের ফকিরের সমান হয়ে গেছি। পরিবার নিয়ে এখন কীভাবে চলব, তা বুঝতে পারছি না।’
রেজু মিয়ার স্ত্রী তানিয়া আক্তার বলেন, তার ও শাশুড়ির খাট-পালং, আলমারি, ঘরের আসবাবপত্র, হাঁড়ি-পাতিল, ধান-চালসহ সবকিছু নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জমিতে পানি দেওয়ার পাম্পও লুট হয়েছে। রান্নার চুলাগুলো ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে। এখন বাড়িতে রান্না করার মতো কোনো সরঞ্জাম নেই।
আহাদ নুর মিয়ার স্ত্রী লিমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, গ্রামের কোনো বাড়িতেই এখন পুরুষ মানুষ নেই। এই সুযোগে বাড়ি থেকে গরু-বাছুর, ধান-চালসহ সবকিছু নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এমনকি পানি পান করার একটি গ্লাসও অবশিষ্ট নেই। তাদের জমির প্রায় ৫০ কিয়ার খড় গভীর রাতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশের ভয়ে বাড়ি ছেড়ে থাকা এলিম উদ্দিনের বাড়ির অবস্থা দেখতে গ্রামে আসেন তার ছোট বোন মাহমুদা আক্তার। তিনি বলেন, এমন ঘটনা তাদের জীবনে কখনো দেখেননি। বাড়িতে পুরুষ সদস্য না থাকার সুযোগে নারীদের গালিগালাজ ও হুমকি দিয়ে মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার অভিযোগ, আব্দুল মান্নান নিহত হওয়ার পর রূপ মিয়ার পক্ষের লোকজন তাদের পক্ষের প্রায় ৪০টি বাড়ির কোনো মালামাল অবশিষ্ট রাখেনি।
তবে লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রূপ মিয়া। তিনি বলেন, বিরোধপূর্ণ জমিটি তার বাবার নামে। তিনি নিজেও সেখানে মাটি ভরাট করেছেন। জমির মালিকানা নিয়ে আজব আলীর সঙ্গে বিরোধ চলছিল। আজব আলীর লোকজনের হামলায় তার চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান নিহত হয়েছেন এবং ৩০ থেকে ৪০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষে তার নিজের বাম পা ও মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। বর্তমানে তিনি বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না।
লুটপাটের বিষয়ে রূপ মিয়া বলেন, তাদের পক্ষের কেউ প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে লুটপাট করেনি। অন্যের মালামাল না নেওয়ার জন্য সবাইকে নিষেধ করা হয়েছে। তার দাবি, প্রতিপক্ষের লোকজন নিজেরাই আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে মালামাল সরিয়ে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন। এ ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে অনুরোধ জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, সংঘর্ষের পর রাতে নিজগাঁও গ্রামে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন। তবে কারা এসব করেছে, তা জানা যায়নি। একটি বাড়ির বড় খড়ের গাদায় আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া ধান-চাল, পাওয়ার টিলার ও ইঞ্জিন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পেয়েছেন তিনি।
শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সুহেল বলেন, সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই কিছু ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে গ্রামের পাশের বাজারে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। রাতের বেলায় লুটপাটের ঘটনা ঘটছে বলে তারাও শুনেছেন। তবে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে নজরদারি করা পুলিশের পক্ষে কঠিন। এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। লুটপাটের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
