• অক্টোবর ৩০, ২০২৬
  • জাতীয়
  • 1
বিরোধী দল সংলাপে এলে জুলাই সনদ নিয়ে নমনীয় হতে পারে সরকার

নিউজ ডেস্কঃ রক্তাক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় সামনে আসছে নতুন নতুন সমীকরণ। সনদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিএনপির দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) নিয়ে ক্ষমতাসীন দলটির অনড় অবস্থান কিছুটা নমনীয় হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি সরাসরি ভিন্নমতের অবস্থান থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়নি। তবে সরকার ও সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সাম্প্রতিক বার্তায় ইঙ্গিত মিলছে, বিরোধী দল আলোচনার টেবিলে এলে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়েও সমঝোতার পথ খুলতে পারে।

এক্ষেত্রে অলিখিত শর্ত হলো, বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধনের মূল আলোচনায় অংশ নিতে হবে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কমিটির শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, বিরোধী দলগুলো আলোচনায় অংশ নিলে তাদের প্রস্তাব, আপত্তি ও ভিন্নমত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

এমনকি জুলাই সনদে দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর কোনো বিষয় পরিবর্তন, পরিমার্জন বা রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন হলে আলোচনার মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি করা যেতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের জন্য মোট ৮৪টি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে এর মধ্যে ৪৭টি প্রস্তাব সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এবং বাকি ৩৭টি বিদ্যমান আইন, অধ্যাদেশ, বিধি বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সনদের মূল চেতনার সঙ্গে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল একমত হলেও বেশ কয়েকটি কাঠামোগত ও মৌলিক বিষয়ে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিল।
বিএনপির ভিন্নমতের অন্যতম বিষয় হলো দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা প্রবর্তন, প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষের ক্ষমতা ও গঠনপ্রণালী, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার নির্দিষ্ট কিছু দিক এবং সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের ভূমিকা।

২০২৬ সালের আগস্টে জাতীয় সংসদে প্রথমে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। পরে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটিটি ১৭ সদস্যে পুনর্গঠন করা হয়। এই কমিটি রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি, আইনজীবী, সাংবাদিক, জুলাই অভ্যুত্থানের যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিশেষ কমিটির বৈঠক হয়। ২৬টি রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ১৫টি দল সরাসরি অংশ নেয় এবং একটি দল লিখিত প্রস্তাব দেয়। বৈঠকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সংবিধান সংশোধনের পূর্ণাঙ্গ খসড়া তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

তবে এ প্রক্রিয়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিরোধী দলের একটি বড় অংশের আলোচনা বর্জন। জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী জোটের কয়েকটি দল বিশেষ কমিটির সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেয়নি। সরকার বারবার বলছে, সংবিধান সংশোধনের মতো রাষ্ট্রের মৌলিক ও দীর্ঘমেয়াদি বিষয়ে বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। অন্যদিকে, বয়কটকারী দলগুলো কমিটির গঠনকাঠামো ও আইনি পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তুলে আলোচনার বাইরে থাকার কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গেও দীর্ঘ বৈঠক করেছে বিশেষ কমিটি। সেখানে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা পরামর্শ দেন, বিরোধী দলকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে বা এড়িয়ে সংবিধানের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দলিলে একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া উচিত হবে না। বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন তারা।

বৈঠকে সাংবাদিকরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তোলেন। উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা, ক্ষমতার সংঘাত, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ সীমিত করা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিয়ে গভীর পর্যালোচনার দাবি ওঠে।

সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, সরকার যেকোনো মূল্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। দ্বিতীয়ত, বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় একগুঁয়েমির বদলে আলোচনার দরজা খোলা রাখতে চায় সরকার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, বিরোধী দলসহ সব পক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেই সংবিধান সংশোধন করা হবে। জুলাই সনদে কোনো দল যে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বিরোধী দল যদি সেই অবস্থান থেকে সরে এসে পরিবর্তন আনতে চায়, তবে সেটিও নিশ্চিতভাবে আলোচনার বিষয় হতে পারে।

এ বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলছে, সরকার এখন ‘নোট অব ডিসেন্ট’-কে চূড়ান্ত বাধা হিসেবে দেখছে না। অন্যদিকে, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান মনে করেন, জুলাই জাতীয় সনদের চেতনা বাস্তবায়নে সংবিধানের ব্যাপক সংশোধন অপরিহার্য। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিও জানিয়েছেন, সনদে স্বাক্ষর করা বিষয়গুলো অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে।

বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে, দলটি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থেকে একচুলও সরে আসেনি। দলটির সিনিয়র নেতা নজরুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিএনপি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থানে অনড় রয়েছে। তার ভাষ্য, সনদের যেসব বিষয়ে দলটি ভিন্নমত জানিয়েছে, সেগুলোই নির্বাচনী ইশতেহারে তুলে ধরে জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়া হয়েছে।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বাংলানিউজকে বলেছেন, বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও প্রতিফলিত হয়ে থাকলে সংবিধান সংশোধনের সময় বৃহত্তর স্বার্থে সেই ইশতেহারও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ, বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে অবস্থান না বদলালেও সরকার তাদের জন্য সম্মানজনক প্রস্থান বা সমঝোতার সুযোগ খোলা রাখছে।

অধ্যাপক গোলাম হাফিজ বাংলানিউজকে বলেন, রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে সংবিধান সংশোধনের টেবিলে। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রত্যাহার করছে না। তবে সরকার বার্তা দিচ্ছে, বিরোধীরা আলোচনায় এলে ভিন্নমতের বিষয়গুলোতে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে সমঝোতার পথ খোলা রাখা হবে।

তিনি বলেন, উচ্চকক্ষ, ৭০ অনুচ্ছেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে কতটা রাজনৈতিক সমঝোতা হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধনের চূড়ান্ত রূপরেখা। সামনের দিনগুলোতে শুধু একটি বিল পাসের প্রশ্ন নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো ও রাজনৈতিক সহনশীলতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও অপেক্ষা করছে।